যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তার পর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এই হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং এক কিশোরসহ কমপক্ষে ২১ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
রুশ অধিকৃত এলাকায় ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জবাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রতিশোধ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরই কিয়েভে এই ভয়াবহ হামলা চালানো হলো।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, শনিবার (২৩ মে) রাতভর চালানো এই হামলায় রাজধানীর আবাসিক ভবন, একটি ছাত্রাবাস, শপিং মল এবং একটি গাড়ি মেরামত কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
শনিবার গভীর রাতে ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী রাশিয়ার শক্তিশালী মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেসনিক’ উৎক্ষেপণের বিষয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করে। কিয়েভের সামরিক প্রশাসক তৈমুর তকাচেঙ্কো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে নাগরিকদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
এর আগে শনিবার দিনের শুরুতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সতর্ক করেছিল, রাশিয়ার পক্ষ থেকে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এক্স-এ বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মার্কিন ও ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে, রাশিয়া ওরেসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা এই তথ্য যাচাই করছি। এই যুদ্ধ যেন আর দীর্ঘায়িত না হয়, সে জন্য বিশ্বনেতাদের পক্ষ থেকে মস্কোর ওপর প্রতিরোধমূলক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।’
হামলার সময় কিয়েভের একটি মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেওয়া ৬২ বছর বয়সী নাতালিয়া জভারিচ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি ছিল এক বিভীষিকাময় রাত। আমরা যখন স্টেশনের দিকে আসছিলাম, তখন মাথার ওপর একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটছিল। প্রচণ্ড আতঙ্কে আমরা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এখানে বসে আছি।’
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলাটি ছিল গত শুক্রবার ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার একটি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। রাশিয়ার দাবি, শুক্রবার পূর্ব লুহানস্কের রুশ-অধিকৃত স্তারোবিলস্ক শহরের একটি কলেজ ছাত্রাবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ১৮টি শিশু নিহত হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাল্টা জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তবে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার এই দাবিকে ‘বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচার’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিয়েভের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের বাহিনী কেবল রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে থাকে।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর মতে, স্তারোবিলস্কে তারা কেবল রাশিয়ার অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির প্রধান কেন্দ্র ‘রুবিকন’ ইউনিটের সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় উভয় পক্ষের এই হতাহতের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার সীমানার ভেতরে এবং অধিকৃত এলাকাগুলোতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। গত সপ্তাহেই ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ রুশ সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে ইউক্রেনের বিমান হামলায় একটি রুশ ড্রোন পাইলট প্রশিক্ষণ শিবিরে অন্তত ৬৫ জন ক্যাডেট ও প্রশিক্ষক নিহত হন। খেরসনে রাশিয়ার একটি নিরাপত্তা বাহিনীর সদর দপ্তর ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চালানো হামলায় প্রায় ১০০ জন রুশ সেনা হতাহত হন বলে দাবি করেন জেলেনস্কি। এ ছাড়া ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার গভীরে রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক কারখানায় সফল ড্রোন হামলার দাবি করেছে কিয়েভ। এই কারখানা থেকে রুশ সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ করা হয় বলে দাবি।
রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ইউক্রেনের এই ক্রমবর্ধমান হামলা এবং তার জবাবে রাশিয়ার সম্ভাব্য ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার চলমান যুদ্ধকে এক নতুন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় নিয়ে গেছে।