গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৭৫ জন শিক্ষার্থী ও এক স্টাফ নিহত হন। এরপর মার্চে ওই হামলার একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি স্কুল চত্বরের ভেতরের ভবনে আঘাত হানছে। ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় দায়ী দুই মার্কিন নৌ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেছে তেহরান।
আজ রোববার ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ায় ইরানি দূতাবাস পৃথকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে দুই কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করে। দুই কর্মকর্তা হলেন—মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস স্প্রুয়্যান্সের কমান্ডিং অফিসার লেই আর টেট এবং এক্সিকিউটিভ অফিসার জেফরি ই. ইয়র্ক।
ইরানের দাবি, এই দুই কর্মকর্তা তিন দফায় টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের নির্দেশ দেন, যার ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এ হামলায় ১৭৫ জন শিক্ষার্থী ও এক স্টাফ নিহত হন, যাদের বড় একটি অংশই ছিল স্কুলছাত্রী (বেশির ভাগই সাত থেকে বারো বছর বয়সী)।
এ বিষয়ে জেনেভায় এক জরুরি বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবে গার্লস স্কুলে হামলাটি ছিল ‘পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে পরিচালিত’।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদন্তে ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পুরোনো বা ভুল গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের কারণে লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল হতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আসলে স্কুলটির পাশের একটি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল, যা আগে একই কমপ্লেক্সের অংশ ছিল। কিন্তু পুরোনো মানচিত্র বা তথ্যের কারণে স্কুলে আঘাত হানে।
মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত এখনো চলমান এবং কেন লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য যাচাই করা হয়নি—সেই প্রশ্নও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন বলেছে, তারা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না এবং ঘটনাটি পর্যালোচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা দাবি করেছেন, হামলার জন্য ইরানও দায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তাতে মনে হচ্ছে এটি ইরান নিজেই করেছে। কারণ আপনারা জানেন, তাদের অস্ত্রগুলোর গতিপ্রকৃতি নির্দিষ্ট নয়। এটি ইরানের কাজ।’
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারির এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নেয়। পরে ইরান পাল্টা হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। সেই সংঘাত এখনো চলমান রয়েছে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
উল্লেখ্য, মার্চের শুরুতে মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর মিনাবের ওই স্কুলে হামলার ভিডিওটির ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ভিডিওটি চত্বরের উল্টো পাশে নির্মাণাধীন একটি আবাসন প্রকল্প থেকে ধারণ করা হয়েছিল। অনলাইন গবেষণা সংস্থা বেলিংক্যাট প্রথম ভিডিওটির অবস্থান শনাক্ত করে। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এআই ভিডিওগুলোতে সাধারণত সুনির্দিষ্ট জায়গার এত নিখুঁত বিবরণ থাকে না, যা এই ভিডিওর সত্যতাকে জোরালো করেছে।
এ ছাড়া প্ল্যানেট কোম্পানির স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে এনপিআর জানিয়েছে, এই চত্বরটি একসময় ইরানি বিপ্লবী গার্ডের একটি নৌ-ঘাঁটি ছিল। তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, গত এক দশক ধরে ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ছিল। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চত্বরের একটি অংশ প্রাচীর দিয়ে আলাদা করে বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করা হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালে চত্বরের রানওয়ে বা বিমান ওঠানামার পথটি সরিয়ে সেখানে আবাসন প্রকল্প শুরু করা হয়।
ভিডিওটির মান খুব উন্নত না হলেও মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল সিকিউরিটির অধ্যাপক জেফরি লুইস জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি দেখতে মার্কিন ‘টমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। আর এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই রয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রেই ইরানের শিশুশিক্ষার্থীরা নিহত হয়।