মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে সম্ভাব্য নতুন সামরিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে; এমনটি জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে তেহরানের তথাকথিত কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করা হবে কি না, সে বিষয়ে ভাবতে গিয়েই এই ব্রিফ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে ইরানের সরকারের বিক্ষোভ দমনের প্রচেষ্টার জবাবে সামরিক হামলার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সামনে যেসব বিকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে, তার মধ্যে তেহরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের দিকেই ইঙ্গিত করে। গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরান হয়তো ইতিহাসে কখনো না দেখা স্বাধীনতার মুখোমুখি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত!!!’
ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয় গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে, মুদ্রা সংকটের প্রতিবাদে। পরে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আকার ধারণ করে। অনেক ইরানি দেশটির ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা’ আমূল পরিবর্তনের দাবি জানান। ইরানি কর্মকর্তারা বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করার হুমকি দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ পর্যন্ত অন্তত কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুক্রবার বলেছেন, বড় আকারের বিক্ষোভের মুখে সরকার ‘পিছু হটবে না।’ বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের জন্য ট্রাম্প বারবার ইরানকে হুমকি দিয়েছেন। শুক্রবার তিনি বলেন, ইরান ‘ভয়াবহ সমস্যায়’ পড়েছে।
শুক্রবার তেল খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের সময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি খুব দৃঢ়ভাবে বলেছি—ওরা যদি আগের মতো মানুষ হত্যা শুরু করে, তাহলে আমরা জড়িত হব। আমরা এমনভাবে আঘাত করব, যা ওদের সবচেয়ে বেশি ব্যথা দেবে। এর মানে স্থলবাহিনী পাঠানো নয়, কিন্তু খুব, খুব কঠিন আঘাত। আমরা চাই না পরিস্থিতি সেদিকে যাক।’
শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফোনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেন বলে তিনটি সূত্র জানিয়েছে। ওই ফোনালাপে ইরানের বিক্ষোভ, সিরিয়ার পরিস্থিতি এবং গাজায় শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। শনিবার ভোরে রুবিও তাঁর ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।’
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ট্রাম্প যখন ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার নির্দেশ দেন, তার পর থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন প্রকাশ্য বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে—ট্রাম্প অন্য ক্ষেত্রেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে এবং দেওয়া হুমকি বাস্তবায়নে প্রস্তুত।
শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের একটি সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে ভেনেজুয়েলায় রাতের অভিযানের ভিডিও পোস্ট করে। সঙ্গে লেখা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে খেলবেন না। তিনি যা বলেন, তা করে দেখান।’ শনিবার জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপিত কিছু বিকল্প সরাসরি দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সেই অংশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত, যারা সহিংসতার মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করছে।
তবে একই সঙ্গে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, যেকোনো সামরিক হামলা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে—ইরানি জনগণকে সরকারের পক্ষে একত্র করতে পারে কিংবা পাল্টা হামলার সূত্রপাত ঘটাতে পারে, যা ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মীদের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য হামলার আগে ওই অঞ্চলে থাকা কমান্ডাররা আরও সময় চাইবেন—মার্কিন সামরিক অবস্থান সুসংহত করা এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির জন্য। কর্মকর্তারা বলেছেন, সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সেই প্রতিশ্রুতির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে—ইরানি সরকার বিক্ষোভ দমন করলে শাস্তি দেওয়া হবে, আবার একই সঙ্গে পরিস্থিতি যেন আরও খারাপ না হয়।
গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেওয়ার ছয় মাসের একটু বেশি সময় পর আবারও দেশটির ওপর হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। ‘মিডনাইট হ্যামার’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে ছয়টি বি-২ বোমারু বিমান ইরানের ফোরদো পাহাড়ি স্থাপনায় ১২টি বাংকার-বাস্টার বোমা ফেলে। একই সঙ্গে নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় ৩০টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। একটি বি-২ বোমারু বিমান নাতাঞ্জে আরও দুটি বাংকার-বাস্টার বোমা ফেলে।
জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আবারও আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেয়। ইরানি নেতারা দাবি করে আসছেন, তাঁদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক উদ্দেশ্যে। গত মাসের শেষ দিকে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে নিজের ব্যক্তিগত ক্লাবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখানে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন, ইরানকে এসব সক্ষমতা বাড়াতে দেওয়া হবে না।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি শুনেছেন ইরান ‘খারাপ আচরণ করছে’ এবং ইরানি কর্মকর্তারা যদি পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখেন, তাহলে ইসরায়েলের হামলাকে তিনি সমর্থন করবেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে প্রায় এক বছরে ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। গত জুনে ইরানে হামলা ও ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও নাইজেরিয়ায়ও বোমা ফেলেছে বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এর আগে ২০২০ সালে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ইরাকের বাগদাদে ড্রোন হামলার নির্দেশ দেন, যাতে ইরানের কুদস বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। কুদস বাহিনী ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের একটি অভিজাত ইউনিট।