হোয়াইট হাউসের ভেতরে জটিল টানাপোড়েনই ইরান যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বদলে যাওয়া প্রকাশ্য বক্তব্যের পেছনে কাজ করছে। সংঘাত যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন তাঁর উপদেষ্টারা বিতর্ক করছেন কখন এবং কীভাবে বিজয় ঘোষণা করা হবে।
ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ও আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজনের বক্তব্য অনুসারে, কিছু কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা সতর্ক করছেন, পেট্রলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রাখার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
এই পর্যবেক্ষণগুলো হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার আগে প্রকাশ না পাওয়া অবস্থাই তুলে ধরে। পর্দার আড়ালের এই তৎপরতা দেখায়, ট্রাম্পের সামনে ঝুঁকি কতটা বড়। তিনি গত বছর ক্ষমতায় ফিরে ‘বোকা’ সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি দেশকে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছেন—যা বৈশ্বিক বাজার কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
ট্রাম্পের কানে জায়গা করে নেওয়ার এই প্রতিযোগিতা তাঁর প্রেসিডেন্সির পরিচিত বৈশিষ্ট্য, তবে এবার এর পরিণতি যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে নির্ধারক। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় যে বিস্তৃত লক্ষ্য তিনি তুলে ধরেছিলেন, সেখান থেকে সরে এসে সাম্প্রতিক দিনে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন এটি একটি সীমিত অভিযান, যার সামরিক লক্ষ্যগুলোর বেশির ভাগই পূরণ হয়েছে।
তবে বার্তাটি অনেকের কাছেই অস্পষ্ট, জ্বালানি বাজারও তার মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বাজার দুই দিকেই দুলছে। বুধবার কেন্টাকিতে এক প্রচার সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ জিতেছি।’ তারপর হঠাৎ সুর বদলে বলেন, ‘আমরা কি আগেভাগে চলে যেতে চাই? আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।’
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ও ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলসহ অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন, তেলের ধাক্কা ও পেট্রলের দাম বাড়লে যুদ্ধের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইতিমধ্যেই দুর্বল সমর্থন দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টারাও একই ধরনের যুক্তি দিচ্ছেন। চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস ও তাঁর ডেপুটি জেমস ব্লেয়ার উচ্চ জ্বালানি মূল্যের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ট্রাম্পকে বিজয়ের সংজ্ঞা সীমিত করতে এবং অভিযানের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে এমন সংকেত দিতে উৎসাহিত করছেন।
অন্যদিকে আরও কড়া অবস্থানের পক্ষে থাকা রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ও টম কটন এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মার্ক লেভিন। তাঁরা যুক্তি দিচ্ছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এবং মার্কিন সেনা ও জাহাজে হামলার জবাব দিতে শক্ত অবস্থান জরুরি।
তৃতীয় একটি শক্তি এসেছে ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠী থেকে। কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন এবং ডানপন্থী টিভি ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, ‘তিনি বাজপাখিদের বিশ্বাস করতে দিচ্ছেন যে অভিযান চলছে, বাজারকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে, আর তাঁর সমর্থকদের বোঝাচ্ছেন যে উত্তেজনা সীমিত থাকবে।’
এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘এই প্রতিবেদনটি এমন গোপন সূত্রের গুজব ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার কক্ষে উপস্থিতই থাকে না। প্রেসিডেন্ট ভালো শ্রোতা হিসেবে পরিচিত এবং নানা মতামত শোনেন, তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেন এবং নিজের বার্তা তিনিই দেন।’
প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের অনেকেই রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেননি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিলেও এ সপ্তাহে তিনি বারবার এটিকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, হোয়াইট হাউসের এক ব্রিফিংয়ে এই শব্দবন্ধটি উঠে আসে, যেখানে ট্রাম্প রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মিয়ামির এক বৈঠকে প্রথম এটি ব্যবহার করেন।
সূত্রটি আরও বলেন, আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে ভাষণের আগে ট্রাম্পকে একটি বার্তা-সংক্রান্ত নথি দেওয়া হয়েছিল, যেখানে যুদ্ধটি স্বল্পমেয়াদি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চায় না এমন সংকেত দেওয়ার কথা বলা হয়। যুদ্ধে যাওয়ার সময় ট্রাম্প খুব কম ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, আর প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্যও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। কখনো বলা হয়েছে আসন্ন ইরানি হামলা ঠেকানো, কখনো পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, আবার কখনো সরকার পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
জনপ্রিয়তা কম এমন সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে ট্রাম্প এখন পরস্পরবিরোধী বয়ান সামলাচ্ছেন, যা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে হরমুজ প্রণালি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর দিকে ইরানের চলমান হামলার কারণে। যুদ্ধের আগে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কার সতর্কবার্তা যাদের উপেক্ষা করা হয়েছিল, সেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারাই এখন বাজারকে আশ্বস্ত করা এবং তেল-গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন।
কিছু হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা এমন এক সমাপ্তি কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন, যেখানে ট্রাম্প ঘোষণা দেবেন যে সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, এরপর নিষেধাজ্ঞা, প্রতিরোধ ও আলোচনার পথে যাওয়া হবে। তবে সবাই এই পন্থার পক্ষে নন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শীর্ষ ইরানি নেতারাও আছেন এবং কেউ কেউ লেবানন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ধ্বংস হয়েছে, নৌবাহিনীর বড় অংশ ডুবে গেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র মিত্রদের সহায়তা করার ক্ষমতা কমে গেছে।
ট্রাম্প বলেছেন অভিযান কখন শেষ হবে তা তিনি নিজেই ঠিক করবেন। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দাবি করছেন, শুরুতে ঘোষিত চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসকরাও নিজেদের বিজয়ী দাবি করবেন, কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা টিকে গেছে এবং পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
যুদ্ধের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই সরু জলপথ দিয়ে যায়, কিন্তু এখন তা প্রায় স্থবির। সাম্প্রতিক দিনে ইরান ইরাকের জলসীমায় ট্যাংকার এবং প্রণালির কাছাকাছি অন্যান্য জাহাজে হামলা করেছে। যদি এই নিয়ন্ত্রণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম খুব বেশি বেড়ে যায়, তাহলে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসে অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াই করছে।
এখন পর্যন্ত তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ আন্দোলনের বেশির ভাগ সদস্য ইরান প্রশ্নে তাঁর পাশে রয়েছেন, যদিও সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী কিছু সমর্থক সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প সম্প্রতি তেহরানের সরকার উৎখাতই যুদ্ধের লক্ষ্য এই ধারণা থেকে সরে এসেছেন। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের নেতৃত্ব অচিরেই পতনের মুখে নয়।
যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে বিভ্রান্তির একটি কারণ ভেনেজুয়েলায় দ্রুত মার্কিন সামরিক সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনের ভাবনার সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র জানান, ৩ জানুয়ারির অভিযানের মতো ইরান অভিযানও একইভাবে এগোবে না তা ট্রাম্পকে বোঝাতে কিছু উপদেষ্টা হিমশিম খাচ্ছিলেন। ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়।
সেই অভিযান ট্রাম্পকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ছাড়াই মাদুরোর অনুগতদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।
কিন্তু ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসজ্জিত প্রতিপক্ষ, যার ধর্মীয় ও নিরাপত্তা কাঠামো গভীরভাবে প্রোথিত। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র ট্রাম্পপন্থী দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছিল। ট্রাম্প গত জুনে বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বোমা হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দিয়েছে।
ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বেশির ভাগ মজুত জুনের হামলায় মাটির নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে তা উদ্ধার করে আবার পরিশোধন করলে অস্ত্রমানের উপাদান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।