হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় বৈধতার সংকটে ইরানের শাসকগোষ্ঠী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী এখন গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সংকটের মুখোমুখি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি চাপ বাড়তে থাকায় দেশটির ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী এক গভীর বৈধতার সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর কোনো পথ আপাতত তাদের হাতে নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত মাসে রাজধানী তেহরানে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এখনো এটি ২০২২–২৩ সালের সেই আন্দোলনের মাত্রায় পৌঁছায়নি, যা মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে তীব্র গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারে। দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের তীব্র দরপতনে ক্ষুব্ধ দোকানিরা প্রথমে রাস্তায় নামেন, পরে আন্দোলনে যুক্ত হন অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষ। এবার বিক্ষোভে নারীদের তুলনায় তরুণ পুরুষদের উপস্থিতিই বেশি, যা মাহসা আমিনিকেন্দ্রিক আন্দোলনের চিত্রের চেয়ে ভিন্ন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংখ্যা ইরানের শিয়া শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের গভীর হতাশা ও অনাস্থারই প্রতিফলন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানে দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়, যা আজ শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট নজরদারি সংস্থা নেটব্লকস। এর মধ্যেই বিদেশ থেকে বিক্ষোভ জোরদারের আহ্বান জানান ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি, যিনি বর্তমানে নির্বাসনে রয়েছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, এটা শুধু রিয়ালের পতন নয়, এটা মানুষের বিশ্বাসের পতন।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি অবস্থান দ্বিমুখী। একদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, অর্থনৈতিক দাবিতে বিক্ষোভ বৈধ এবং তা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। অন্যদিকে, বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে এবং রাস্তায় সংঘর্ষ চলছে। ইসলামি বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর ইরানের ধর্মীয় শাসকেরা তাঁদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশার মধ্যকার ব্যবধান ঘোচাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশত থেকে ফোনে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেন ২৫ বছর বয়সী মিনা। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন এবং বর্তমানে বেকার। মিনা বলেন, ‘আমি শুধু শান্ত ও স্বাভাবিক একটা জীবন চাই। অথচ তারা পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার দিকেই জোর দিচ্ছে।’ তাঁর ভাষায়, ১৯৭৯ সালে হয়তো এসব নীতি অর্থবহ ছিল, আজ নয়। বিশ্ব বদলে গেছে।

শাসকগোষ্ঠীর সংস্কারপন্থী শিবিরের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল আদর্শিক স্তম্ভ—বাধ্যতামূলক পোশাকনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু ৩০ বছরের নিচের জনগোষ্ঠীর কাছে এগুলো আর গ্রহণযোগ্য নয়। তরুণ প্রজন্ম বিপ্লবী স্লোগানে বিশ্বাস করে না, তারা মুক্তভাবে বাঁচতে চায়।

মাহসা আমিনির আন্দোলনে যে হিজাব বড় ইস্যু ছিল, তা এখন অনেক জায়গায় বেছে বেছে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বহু ইরানি নারী প্রকাশ্যেই হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন—যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে।

চলমান বিক্ষোভে অনেকে ইরানের আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ‘গাজা নয়, লেবানন নয়—আমার জীবন ইরানের জন্য’—এমন স্লোগান শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন শহরে।

ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি ও ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এর পাশাপাশি সিরিয়ায় ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল–আসাদের পতন তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও ক্ষুণ্ন করেছে।

রয়টার্সের যাচাই করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীরা একটি বড় ইরানি পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলছেন। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমের ইলম প্রদেশের আবদানানে আনন্দোচ্ছ্বাসে মিছিল করেন বিক্ষোভকারীরা।

আরেকটি ভিডিওতে (রয়টার্স ভিডিওটি যাচাই করতে পারেনি) উত্তর-পূর্বের গোনাবাদ শহরে একদল তরুণকে একটি মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভে যোগ দিতে দেখা যায়—যা অনেকের কাছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহের ইঙ্গিত।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা অতীতে দমন-পীড়ন ও সীমিত ছাড় দিয়ে একাধিক আন্দোলন সত্ত্বেও টিকে গেছে। তবে এবার সেই কৌশল সীমার মুখে। পরিবর্তন এখন অনিবার্য মনে হচ্ছে। শাসনব্যবস্থার পতন সম্ভব, তবে নিশ্চিত নয়।

এদিকে এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে তিনি তাঁদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারেন। ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা প্রস্তুত।’ তবে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই পরিস্থিতিকে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের সবচেয়ে সংকটময় সময়গুলোর একটি হিসেবে দেখছেন। তবে তিনি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান ‘শত্রুর কাছে কখনোই মাথা নত করবে না’। তিনি এই বিক্ষোভে বিদেশি শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কথাও বলেছেন।

তবে ইরানের ভেতরে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এমনকি সরকারবিরোধীরাও এ বিষয়ে দ্বিধায়। মধ্য ইরানের ইসফাহানের ৩১ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বলেন, ‘৫০ বছর ধরে এই সরকার আমাদের শাসন করছে। ফল কী? আমরা দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন ও হতাশ।’ তবে বিদেশি হস্তক্ষেপ চান কি না—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘না। আমরা আর যুদ্ধ চাই না। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ছাড়া শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ইরান চাই।’

‘চীন-রাশিয়াকে ঠেকাতে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা লাগবেই’, ট্রাম্প কেন এত মরিয়া

ইউক্রেনে ফের শক্তিশালী ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, পশ্চিমাদের কঠোর বার্তা দিল রাশিয়া

ট্রাম্পকে খুশি করতে দেশে ভাঙচুর চালাচ্ছে বিক্ষোভকারীরা, মন্তব্য খামেনির

ইরানের ফারদিসে বৃহস্পতিবার রাতে ব্যাপক সহিংসতা হয়, মাটিতে পড়ে ছিলেন ৮-১০ জন

বিক্ষোভের মুখে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার কথা স্বীকার করল ইরান সরকার

শুক্রবার রাতেও তেহরানের রাজপথ দখলে নিল বিক্ষোভকারীরা, সংঘর্ষ চলছে

ইরানে বিক্ষোভে অন্তত ৪৮ জন নিহত, দাবি এইচআরএএনএর

দমনপীড়নের মধ্যেও তেহরানের রাস্তায় ফের বিক্ষোভ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

যোগযোগ বিচ্ছিন্ন ইরান থেকে যেসব খবর আসছে

শব্দের চেয়ে ১০ গুণ গতির মিসাইল দিয়ে ইউক্রেনে আঘাত রাশিয়ার