কয়েক শ মিলিয়ন ভিউ নিয়ে ইউটিউবার ঘানেম আল-মাসারির তখন দারুণ সময় কাটছিল। লন্ডনের ওয়েম্বলিতে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তিনি সৌদি রাজপরিবারের কড়া সমালোচনা করতেন। কখনো সাহসী কণ্ঠস্বর ও কখনো আক্রমণাত্মক এই কৌতুকশিল্পী ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন। তবে ভক্তদের পাশাপাশি তিনি তৈরি করেছিলেন কিছু শত্রুও।
প্রথমে আল-মাসারির লক্ষ করেন, তাঁর ফোনগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ফোনগুলো খুব ধীর হয়ে যাচ্ছিল, আর ব্যাটারি অস্বাভাবিক দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এরপর তিনি দেখতে পান, লন্ডনের বিভিন্ন জায়গায় একই ব্যক্তিদের বারবার দেখা যাচ্ছে। যাদের তিনি সৌদি সরকারের সমর্থক বলে মনে করতেন, তারা রাস্তায় তাঁকে থামিয়ে হয়রানি করত এবং ভিডিও করত। কিন্তু তারা সব সময় জানত তিনি কোথায় আছেন—কীভাবে?
আল-মাসারির আশঙ্কা ছিল, তাঁর ফোন দিয়েই তাঁর ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। পরে সাইবার বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন, কুখ্যাত পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে তাঁকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।
আল-মাসারির বিবিসিকে বলেন, ‘এটা এমন কিছু ছিল, যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। তারা আপনার অবস্থান দেখতে পারে, ক্যামেরা চালু করতে পারে, মাইক্রোফোন চালু করে আপনার কথা শুনতে পারে। আপনার সব তথ্য-ছবি, সবকিছু তাদের হাতে চলে যায়।’
ছয় বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর গত সোমবার লন্ডনের হাইকোর্ট রায় দেন, সৌদি আরবই এর জন্য দায়ী। আদালত সৌদি আরবকে আল-মাসারির ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৩০ লাখ পাউন্ডের বেশি (প্রায় ৪.১ মিলিয়ন ডলার) জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
দ্য ঘানেম শো
ঘানেম আল-মাসারির ইউটিউব চ্যানেলে সৌদি রাজপরিবারের ছবি পেছনে রেখে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা করতেন। চ্যানেলটির এখনো ছয় লাখ সাবস্ক্রাইবার রয়েছে, তবে তিনি আর ভিডিও প্রকাশ করেন না।
২০১৮ সালে আল-মাসারির আইফোন হ্যাক হয়। তিনি তিনটি এসএমএসে পাঠানো লিংকে ক্লিক করেছিলেন, যেগুলো দেখতে সংবাদমাধ্যমের বিশেষ সদস্যপদের প্রস্তাব বলে মনে হয়েছিল। এর ফলে তিনি ওই লিংকে ক্লিক করেন। শুরু হয় হয়রানি এবং ওই বছরের আগস্টে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে মারধরের শিকার হন।
আদালতে বলা হয়, দুই অপরিচিত ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে জানতে চায়, তিনি কে যে সৌদি রাজপরিবার নিয়ে কথা বলেন। এরপর তারা তাঁকে ঘুষি মারে এবং মারধর শুরু করে। পথচারীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা সরে যায়। চলে যাওয়ার সময় তারা তাঁকে ‘কাতারের দাস’ বলে গালি দেয় এবং বলে, তাঁকে ‘শিক্ষা দেওয়া হবে’।
হাইকোর্টের বিচারক জানান, এই হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং হামলাকারীদের একজনের কানে ইয়ারপিস ছিল। বিচারক লিখিত রায়ে বলেন, এমন শক্ত ভিত্তি রয়েছে যে এই হামলা ও হ্যাকিং সৌদি আরব সরকার অথবা তাদের পক্ষে কাজ করা এজেন্টদের নির্দেশে বা অনুমোদনে হয়েছে। বিচারক আরও বলেন, ঘানেমের সমালোচনা বন্ধ করার স্পষ্ট আগ্রহ ও উদ্দেশ্য ছিল সৌদি আরবের।
হামলার পরও হয়রানি বন্ধ হয়নি। ২০১৯ সালে কেনসিংটনের একটি ক্যাফেতে এক শিশু আল-মাসারির কাছে এসে সৌদি বাদশাহ সালমানের প্রশংসায় গান গায়। ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, একটি হ্যাশট্যাগসহ ট্রেন্ড করে এবং এমনকি সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়। একই দিনে পশ্চিম লন্ডনের একটি রেস্তোরাঁ থেকে বেরোনোর সময় এক ব্যক্তি তাঁকে বলে যায়, তোমার দিন ফুরিয়ে আসছে।
ঘানেম আল-মাসারির জন্ম সৌদি আরবে হলেও তিনি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। প্রথমে পোর্টসমাউথে পড়াশোনার জন্য এসেছিলেন। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক এবং ওয়েম্বলিতে থাকেন। তবে হামলার পর থেকে তিনি খুব একটা বাড়ির বাইরে যান না, লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে যাওয়া এখনো তাঁর কাছে ভীতিকর।
৪৫ বছর বয়সী আল-মাসারির খ্যাতি আসে আরবি ভাষাভাষী বিশ্বে সৌদি শাসকদের, বিশেষ করে ক্রাউন প্রিন্স ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানকে ব্যঙ্গ করে বানানো ভিডিওর মাধ্যমে। তাঁর ভিডিওগুলো প্রায়ই ভাইরাল হতো, মোট ভিউ ছাড়িয়ে গেছে ৩৪ কোটি ৫০ লাখ।
সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওটি (যার ভিউ ১ কোটি ৬০ লাখ) সৌদি আরবে মেয়েদের নাচের একটি ভিডিও নিয়ে সরকারের ক্ষোভের সমালোচনা করে। রহস্যজনকভাবে ভিডিওটির শব্দ ইউটিউব থেকে মুছে গেছে, কীভাবে বা কখন তা হয়েছে তিনি জানেন না।
ফোন হ্যাক ও হামলার পর আল-মাসারি ভেঙে পড়েন, তিনি বিষণ্ন ও ভীত হয়ে পড়েন। একসময় যিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও সাহসী, তিনি এখন বিবিসির সঙ্গে কথা বললেও পুরো মুখ দেখাতে চাননি।
তিন বছর ধরে তিনি আর কোনো ভিডিও দেননি। তাঁর ভাষায়, আইনি বিজয় সত্ত্বেও সৌদি সরকার তাঁকে কার্যত চুপ করিয়ে দিতে পেরেছে। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ টাকায় হতে পারে না। এই হ্যাক আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমি আর আগের ঘানেম নই।’
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিজেন ল্যাবের স্পাইওয়্যার বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন, ‘আল-মাসারির ফোন পেগাসাস স্পাইওয়্যারে আক্রান্ত হয়েছিল। তাঁরা লন্ডনে বিশ্লেষক পাঠিয়ে বলেন, এটি সৌদি আরবের পক্ষ থেকেই করা হয়েছিল বলে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।’
পেগাসাস একটি শক্তিশালী ও বিতর্কিত স্পাইওয়্যার, যা তৈরি করেছে ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, তারা এটি শুধু সন্ত্রাসী ও অপরাধী ধরতে সরকারগুলোর কাছে বিক্রি করে। তবে সিটিজেন ল্যাব এই সফটওয়্যার রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ফোনেও খুঁজে পেয়েছে, আল-মাসারির ফোনও তার মধ্যে রয়েছে।
শুরুতে সৌদি আরব দাবি করেছিল, ১৯৭৮ সালের স্টেট ইমিউনিটি আইনের আওতায় তাঁরা মামলার বাইরে। কিন্তু ২০২২ সালে আদালত রায় দেয়, এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব দায়মুক্তি পাবে না। এর পর থেকে সৌদি আরব আর কোনো শুনানিতে অংশ নেয়নি।
বিচারক বলেন, সৌদি আরব আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি এবং একাধিক আদালতের আদেশ অমান্য করেছে। মামলায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৬২২ পাউন্ড। তবে সৌদি আরব এই অর্থ পরিশোধ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিবিসি লন্ডনে সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো জবাব পায়নি। আল-মাসারির বলেন, তিনি রায় কার্যকর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
তবে তাঁর ভাষায়, ‘লন্ডনের মতো জায়গায় তারা (সৌদি গুপ্তচর) এমন কিছু করে পার পেয়ে গেছে, এই ভাবনাটাই আমাকে বিষণ্ন করে তোলে।’