গাজায় নতুন পুলিশ বাহিনী গঠনে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মাদক চক্রের সদস্যদের নিয়োগ দিতে চায় হোয়াইট হাউস—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ।
একাধিক পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাতে টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন একটি নতুন নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা দিয়েছে, যেখানে হামাসবিরোধী বিদ্যমান সশস্ত্র মিলিশিয়া সদস্যদের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের সময় থেকে ইসরায়েল এসব গোষ্ঠীর কিছু অংশকে অস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবেও তাদের সমর্থন রয়েছে।
তবে এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শান্তি বাহিনীর অংশ করার পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘আপত্তি’ তৈরি হয়েছে।
গাজায় পরিবারভিত্তিক এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সম্পর্ক রয়েছে বলে নথিপত্রে উল্লেখ আছে। স্থানীয় বেসামরিক জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ত্রাণবাহী ট্রাক লুট, হত্যা ও অপহরণের অভিযোগ উঠেছে।
অন্তত দুটি বড় মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে লড়াই করেছে বা সংগঠনটির প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক সূত্র দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, বিশ্বস্ত নিরাপত্তা অংশীদার ছাড়া ট্রাম্পের শান্তিপ্রক্রিয়া কার্যকর হবে না। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ প্রেসিডেন্টের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের চেষ্টায় যুক্ত কয়েকটি দেশও উদ্বেগ জানিয়েছে।
চার মাস আগে যুদ্ধবিরতির পরও হামাস-পরবর্তী পুলিশ বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা কার্যত স্থবির হয়ে আছে—এর গঠন ও অর্থায়ন নিয়ে মতভেদের কারণে। হামাস স্বেচ্ছায় নিরস্ত্র হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আগামী বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্প তাঁর ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী বৈঠক আহ্বান করেছেন, যেখানে ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। আয়োজকদের আশা, গাজা পুনর্গঠনের জন্য অর্থায়নের অঙ্গীকার এবং জাতিসংঘ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর (আইএসএফ) জন্য সেনা প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আইএসএফ নতুন গাজা পুলিশ বাহিনীর ওপর তদারকি করবে এবং গাজা উপত্যকার বাইরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করবে।
গতকাল রোববার ট্রাম্প বলেন, গাজা পুনর্গঠনের জন্য ইতিমধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের খসড়া প্রস্তুত এবং আইএসএফ ও স্থানীয় পুলিশের জন্য ‘হাজারো’ সদস্যের প্রতিশ্রুতি মিলেছে।
নতুন পুলিশ বাহিনীতে গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা বড়দিনের আগেই সামনে আসে, যা দক্ষিণ ইসরায়েলে অবস্থিত বহুজাতিক সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টারে মতবিরোধ সৃষ্টি করে।
এক পশ্চিমা সূত্র বলেন, অনেকেই বলেছে, এটা হাস্যকর। তারা শুধু অপরাধী চক্রই নয়, ইসরায়েল-সমর্থিতও।
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে আনতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত অংশে অস্থায়ী ‘নিরাপদ’ কমিউনিটি গড়ার পরিকল্পনাও তিনি এগিয়ে নিচ্ছেন।
প্রথম কমিউনিটি রাফাহ শহরের আগের স্থানে নির্মাণাধীন, সেখানে ‘পপুলার ফোর্সেস’ নামের ইসরায়েল-সমর্থিত একটি মিলিশিয়ার প্রভাব রয়েছে। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও ত্রাণ লুটের অভিযোগ রয়েছে। তাদের সাবেক নেতা ইয়াসের আবু শাবাব গত ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ বিরোধে নিহত হন।
কুশনার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী আরিয়েহ লাইটস্টোনের সঙ্গে, যিনি নিরাপত্তা ইস্যুতে ইসরায়েলি অবস্থানের প্রতি আদর্শগতভাবে ঝুঁকে আছেন বলে সূত্র জানায়।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা কুশনার ও লাইটস্টোনের ‘আদর্শনির্ভর’ দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের যদি হামাসকে ছুড়ে ফেলার সুযোগ দেওয়া হয়, তারা তা নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক গাজাবাসী হামাসকে পছন্দ না করলেও অন্য গোষ্ঠীগুলোকে বিশ্বাস করে না।
গাজা পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে কাকে আনা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে হোয়াইট হাউস এই পদ্ধতির প্রস্তাব দেওয়ার কথা অস্বীকার করেনি।
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ বাহিনীর জন্য যাচাই-বাছাইপ্রক্রিয়া প্রণয়নে পরিকল্পনা চলছে। প্রেসিডেন্ট যেমন বলেছেন, হামাসকে সম্পূর্ণ ও অবিলম্বে নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।