ইউক্রেনের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলো এক সময় টানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কার্যত ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই উড়তে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, কিয়েভের মিত্র দেশগুলো থেকে সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। আর ঠিক সেই সময় রাশিয়া শীতকালে বিশাল বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি অবগত তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই তীব্র সংকট দেখা দেয়। এই ঘটনা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার বড় দুর্বলতা সামনে আনছে। কারণ, রাশিয়ার নিয়মিত হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউক্রেন প্রায়ই অস্ত্রের ঘাটতির কথা বলে আসছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সংকট নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে অসন্তুষ্ট না করার চেষ্টাও করেছে। ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা অস্ত্রের প্রয়োজন দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধের শেষ এখনো দৃষ্টিগোচর নয়। এর ওপর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় ইউক্রেনের পুরো এফ-১৬ স্কোয়াড্রনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এআইএম-৯ ‘সাইডউইন্ডার’ আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি ছিল।
ইউক্রেন প্রায়ই অস্ত্রের অভাব নিয়ে সরব হলেও, সেই ঘাটতি তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তার নির্দিষ্ট উদাহরণ গোপন রাখা হয়। তবে এই বিষয়ে একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রায় এক মাস সময়ে ইউক্রেনের যুদ্ধবিমানগুলোতে বসানোর মতো কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই ছিল না। ঠিক কী কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছিল তা জানা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বিলম্বের কারণে নাকি ইউরোপীয় দেশগুলোর দেরির কারণে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
প্রথম সূত্র জানিয়েছে, ইউক্রেনের বিদেশি অংশীদাররা কিয়েভকে জানিয়েছিল যে—তাদের কাছে আর কোনো মজুত নেই। তবে কোন দেশ এ কথা বলেছে, তা তারা উল্লেখ করেনি।
ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় ইউক্রেনের এফ-১৬ পাইলটরা দিনের বেলায় মিশনে উড়ে ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করতেন বিমানের কামান দিয়ে। দ্বিতীয় সূত্র জানিয়েছে, রাতে এমন মিশন চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। অথচ রাশিয়ার ড্রোন হামলাগুলোর বেশিরভাগই হয় রাতের অন্ধকারে। পাইলটরা আগে কোনো মিশনে কাজ না করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আবার ব্যবহার করার চেষ্টাও করতেন, রক্ষণাবেক্ষণের পর সেগুলো কাজ করতে পারে এই আশায়। কিছু ক্ষেত্রে তা সফলও হয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইউক্রেনের এফ-১৬ পাইলটরা মূলত এআইএম-৯ ক্ষেপণাস্ত্রের ‘লাইমা’ ও ‘মাইক’ সংস্করণের ওপর নির্ভর করছিলেন। এই সংস্করণগুলো ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে তৈরি। যদিও এগুলো কয়েক দশক পুরোনো, তবু তুলনামূলক কম খরচে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে এগুলো ইউক্রেনের জন্য কার্যকর ছিল বলে তিনটি সূত্র জানিয়েছে।
ডিসেম্বরে এসে এই সংকট কাটে। তখন ইউক্রেন তাদের মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আবার এআইএম-৯ আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র পায়। বড় একটি রুশ হামলার ঠিক আগেই এই সরবরাহ আসে। তবে নিরাপত্তার কারণে কোন দেশ বা দেশগুলো এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে, তা সূত্রগুলো প্রকাশ করেনি। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ন্যাটো সদস্য জার্মানি ও কানাডা সাইডউইন্ডার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে এর আগে সরবরাহে কিছুটা ‘কমতি’ দেখা দিয়েছিল, যদিও কেন তা হয়েছিল তিনি বলেননি।
সরবরাহ আপাতত বাড়লেও ইউক্রেনের জন্য তাদের বিস্তৃত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বড় ধরনের হামলার সময় রাশিয়া শত শত আক্রমণাত্মক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এগুলো ঠেকাতে ইউক্রেন ট্রাকে বসানো কামান, ইলেকট্রনিক জ্যামিং, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানুয়ারিতে জরুরি ভিত্তিতে গোলাবারুদের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার জন্য, যা দিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ইস্কান্দার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে। ২০২৪ সালে ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করে। এগুলো এখন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের আকাশভিত্তিক অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হেলিকপ্টার ও অন্যান্য যুদ্ধবিমানও এই ব্যবস্থার অংশ। দ্বিতীয় সূত্র জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষার ভূমিকায় মিশন চালিয়ে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলো ইতিমধ্যে দুই হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ইউক্রেন বা তাদের মিত্ররা এখনো প্রকাশ করেনি ঠিক কতগুলো এফ-১৬ বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে। দ্বিতীয় সূত্র বলেছে, সংখ্যাটি ‘ডজনখানেকের মধ্যে’, তবে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এআইএম-৯ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এছাড়া আরও উন্নত এআইএম-১২০ ক্ষেপণাস্ত্রও বহন করতে পারে। এগুলো তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানি আরটিএক্স করপোরেশনের অধীনস্থ রেথিয়ন।
তিনটি সূত্রের মধ্যে দুইটি জানিয়েছে, প্রতিটি এআইএম-১২০ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম এক মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে তুলনামূলক সস্তায় তৈরি রাশিয়ার ড্রোন ভূপাতিত করতে এগুলো সাধারণত ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় না। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনের নরওয়েতে তৈরি নাসামস ভূমি-থেকে-আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও ব্যবহৃত হয়। সরবরাহ সংকটের সময় এই ব্যবস্থার কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছিল বলে তৃতীয় সূত্র জানিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি আরআইএম-৭ ক্ষেপণাস্ত্রেরও ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। ইউক্রেন ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সোভিয়েত আমলের সংশোধিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। নরওয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই শীতের শুরুতে সরকার নাসামস ব্যবস্থার জন্য “উল্লেখযোগ্য সংখ্যক” ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করেছে, যাতে এই ব্যবস্থা ইউক্রেনের নাগরিকদের প্রাণঘাতী বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।