মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গতকাল বুধবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলাকালীন লেবাননে হামলার ক্ষেত্রে ইসরায়েল কিছুটা সংযম প্রদর্শনের প্রস্তাব দিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নতুন করে শুরু করা হামলা যুদ্ধবিরতির স্থিতিশীলতার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ফলে ইরান শনিবারের নির্ধারিত আলোচনা থেকে সরে আসার হুমকি দিয়েছে।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ করা ছিল এই যুদ্ধবিরতির অন্যতম প্রধান শর্ত। ইরান এখন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, লেবাননে লড়াই চললে তারা পুনরায় যুদ্ধ শুরু করবে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। এরই মধ্যে হরমুজ আবারও বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক পোস্টে স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয় যুদ্ধবিরতি নতুবা ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ—এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। মিসরও এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছে।
ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘যৌক্তিক ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানিরা ভেবেছিল যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এমন প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ভ্যান্স জানান, যুদ্ধবিরতি মূলত ইরান, আমেরিকা এবং তাদের মিত্র ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। তবে ইসরায়েলিরা আলোচনা সফল করার স্বার্থে নিজেরাই লেবাননে কিছুটা সংযম দেখানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ভ্যান্স আরও যোগ করেন, লেবানন ইস্যুতে ইরান যদি আলোচনা থেকে সরে আসে তবে সেটি হবে তাদের একটি বোকামি সিদ্ধান্ত।
এদিকে, পাঁচ সপ্তাহ আগে যখন ইরানে মার্কিন–ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরু হয়, তখন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলেছিল। জবাবে ইসরায়েল বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়ে বড় অংশ দখল করে নেয়। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত তারা সৈন্য প্রত্যাহার করবে না।
এর আগে, গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তখন তিনি বলেছিলেন এটি লেবাননসহ সর্বত্র প্রযোজ্য হবে। কিন্তু এর পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে দাবি করেন, লেবানন এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। নেপথ্যের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপে লেবাননে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন তারা।
গতকাল বুধবার ইসরায়েলি বিমান বাহিনী বৈরুত, বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, যা যুদ্ধের শুরু থেকে সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা হিসেবে পরিচিত। ৫০টি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে প্রায় ১০০টি তথাকথিত কমান্ড সেন্টার ও সামরিক স্থাপনায় ১৬০টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
লেবাননের রেড ক্রস জানিয়েছে, এতে ৮০ জনের বেশি নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়েছেন। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, লেবাননে হামলা চললে ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে।
এছাড়া, বুধবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলের ট্যাঙ্কারগুলো ফের আটকে দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ উভয়ই এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন এবং সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। হিজবুল্লাহও জানিয়েছে যে, এই হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।