সরকারি দায়িত্ব পালনকালে অসদাচরণের অভিযোগে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটের উড ফার্ম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁকে স্পর্শকাতর তথ্য দেওয়ার অভিযোগে দীর্ঘ তদন্তের পর এই পদক্ষেপ নিল ব্রিটিশ পুলিশ।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে সাদা পোশাকে পুলিশ এবং নামফলকহীন পুলিশের গাড়ির আনাগোনা দেখা যায়। এরপরই টেমস ভ্যালি পুলিশের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘সরকারি পদে অসদাচরণের সন্দেহে আজ আমরা নরফোক থেকে ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছি। বর্তমানে বার্কশায়ার এবং নরফোকের বেশ কিছু ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’ পুলিশ নিশ্চিত করেছে, ওই ব্যক্তি বর্তমানে তাদের হেফাজতে রয়েছেন।
অভিযোগের নেপথ্যে কী
সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু যখন ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তিনি জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গোপন ও স্পর্শকাতর তথ্য শেয়ার করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করার পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
টেমস ভ্যালি পুলিশ আগে থেকেই দুটি বিষয় খতিয়ে দেখছিল। প্রথমত, এপস্টেইন কর্তৃক অ্যান্ড্রুর কাছে যৌন সম্পর্কের জন্য এক নারীকে যুক্তরাজ্যে পাচার করার অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য দূত হিসেবে কাজ করার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী এপস্টেইনকে সরকারি নথিপত্র এবং গোপন সফরসূচি সরবরাহ করা।
টেমস ভ্যালি পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ কনস্টেবল অলিভার রাইট বলেন, ‘একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর আমরা সরকারি পদে অসদাচরণের এই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছি। আমাদের তদন্তের নিরপেক্ষতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এই মামলার বিষয়ে জনসাধারণের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে, তাই সঠিক সময়ে আমরা পরবর্তী তথ্য জানাব।’
অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর (৬৬) বরাবরই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত ই-মেইলগুলোতে দেখা গেছে, ২০১০ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরের সময় অ্যান্ড্রু তাঁর বিস্তারিত সফরসূচি এবং রিপোর্ট এপস্টেইনকে পাঠিয়েছিলেন।
নতুন প্রকাশিত নথিতে অ্যান্ড্রুর অন্তত তিনটি ছবি পাওয়া গেছে, যা রাজপরিবারের জন্য চরম অবমাননাকর বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবিতে অ্যান্ড্রুকে জিন্স ও সাদা পোলো শার্ট পরা অবস্থায় এক নারীর ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখা গেছে। একটি ছবিতে তিনি সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন এবং অন্যটিতে ওই নারীর পেটে হাত দিয়ে আছেন। তবে ছবির ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এ ছাড়া ২০১০ সালের আগস্টের এক ই-মেইলে দেখা যায়, এপস্টেইন অ্যান্ড্রুকে ‘দ্য ডিউক’ সম্বোধন করে এক ২৬ বছর বয়সী ‘সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী’ রুশ নারীর সঙ্গে নৈশভোজের প্রস্তাব দিচ্ছেন। জবাবে অ্যান্ড্রু সেই নারীর সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এপস্টেইন লন্ডনে থাকাকালে অ্যান্ড্রুকে ই-মেইল করেন যে তাঁদের ‘ব্যক্তিগত সময়’ প্রয়োজন। জবাবে অ্যান্ড্রু তাঁকে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান এবং সেখানে ‘প্রচুর গোপনীয়তা’ বজায় থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে থেকে জানা গেছে, অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা ভার্জিনিয়া জিওফ্রে গত বছরের এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ায় নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অ্যান্ড্রু সব সময়ই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন, যদিও ২০২২ সালে তিনি জিওফ্রের সঙ্গে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে আদালতের বাইরে রফাদফা করেছিলেন।
উল্লেখ্য, এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় ব্রিটিশ রাজপরিবার নতুন করে অস্বস্তিতে পড়েছে। গত বছরই রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁর ভাইয়ের রাজকীয় উপাধি কেড়ে নিয়েছিলেন এবং স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ তাঁর ৬৬তম জন্মদিনেই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেন সাবেক এই রাজপুত্র।