হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ইরানে হামলা হতে পারে আজই, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করেছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানে পূর্ণাঙ্গ হামলা না চালিয়ে সুপরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে বিক্ষোভ উসকে দিয়ে রেজিম চেঞ্জের মতো পরিস্থিতি তৈরির চিন্তা ভাবনা করছেন ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদেশগুলোর নেতৃত্বকে মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে চলতি সপ্তাহান্তেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার অনুমোদন দিতে পারেন। একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ড্রপ সাইট নিউজ। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলার সিদ্ধান্ত নিলে আজ রোববার থেকেই অভিযান শুরু হতে পারে।

ড্রপ সাইট নিউজকে দেওয়া এক বক্তব্যে সাবেক এক শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নয়। এটা মূলত সরকার পরিবর্তনের বিষয়।’ তিনি বর্তমানে আরব সরকারগুলোর পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও অন্যান্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে ইরানি সরকারের ‘শিরশ্ছেদ’ করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসি বর্তমানে ইরানের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব রাখছে।

ওই সূত্র আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা হলো—ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে সফল হামলার পর সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার উৎখাত হবে। সাবেক ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘হামলার অপেক্ষা করছেন’ এবং তিনি ট্রাম্পকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি নতুন সরকার গঠনে ইসরায়েল সহায়তা করতে পারবে।

ড্রপ সাইট নিউজকে দেওয়া তথ্যে দুজন জ্যেষ্ঠ আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁরা খবর পেয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘যেকোনো মুহূর্তে’ শুরু হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ ঠেকাতে তৎপর কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছে। শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্কের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাতে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা যায়।

এ ছাড়া ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক—এই তিন দেশের মধ্যে একটি গোপন বৈঠকের কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য একটাই—আসন্ন হামলা ঠেকানো। এরই মধ্যে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন হামলায় নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানায়, মঙ্গলবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপে এই অবস্থান জানানো হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও সোমবার ঘোষণা দিয়েছে, তারা কোনো সামরিক অভিযানে ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের আকাশসীমা বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হোয়াইট হাউস ড্রপ সাইট নিউজকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুক্রবার ওভাল অফিসে দেওয়া বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে। সেখানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের একটি বিশাল নৌবহর, যাকে যাই বলুন এই মুহূর্তে ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’ তবে ইরানকে যুদ্ধ এড়াতে কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

জবাবে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বৃহস্পতিবার ইরানি টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যদি আমেরিকানরা এমন কোনো ভুল হিসাব করে, তাহলে বিষয়টি ট্রাম্প যেমন ভাবছেন, তেমন হবে না। দ্রুত একটি অভিযান চালিয়ে দুই ঘণ্টা পর টুইট করে বলা—অপারেশন শেষ; এভাবে হবে না।’

মোহাম্মদ আকরামিনিয়া আরও বলেন, ‘যুদ্ধের পরিধি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে যেসব দেশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে আশ্রয় দিয়েছে, সবই আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতায় থাকবে।’ ইরানের কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, বিশেষ করে যদি শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তারা নজিরবিহীন পাল্টা হামলা চালাবে। এসব হামলার লক্ষ্য হবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, তেল অবকাঠামো এবং ইসরায়েল।

এই সপ্তাহে মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির শুনানিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে এসব ঘাঁটি ইরানের ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় পড়তে পারে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান বেশির ভাগ সময় সংযম দেখিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলেও ইরান অনেক ক্ষেত্রে আগাম সংকেত দিয়ে সীমিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, যাতে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো যায়।

এর আগে ইসরায়েলের হামলার জবাবে, যেমন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আইআরজিসি স্থাপনায় হামাসের রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার পর—ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে গোপন পথে জানিয়ে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল। এতে বড় ধরনের প্রাণহানি হয়নি এবং উত্তেজনাও নিয়ন্ত্রণে ছিল।

২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরও একই কৌশল নেওয়া হয়। তখন ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আগাম সংকেত দিয়ে হামলা চালায়।

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আবার হামলা হলে তারা আর এই নীতি অনুসরণ করবেন না। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফোয়াদ ইজাদি ড্রপ সাইট নিউজকে বলেন, অতীতে ইরানের কিছু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রকে আগাম জানিয়ে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের সময় পার করা এবং বড় সংঘাতে না যাওয়া। তিনি বলেন, ‘তারা সীমিতভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু জুনে তাঁরা নিহত হন’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো ১২ দিনের বোমা হামলায়।

ইজাদি বলেন, নতুন সামরিক নেতৃত্ব মনে করছে, আগের নীতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি যা শুনেছি, লক্ষ্য হলো অন্তত ৫০০ মার্কিন সেনাকে হতাহত করা। ইরানে আবার হামলা হলে কমপক্ষে ৫০০ সেনার প্রাণহানি ঘটাতে হবে।’ তাঁর ভাষায়, “ইরান সরকার ও সামরিক বাহিনী এবার কঠোর জবাব দিতে চায়। কারণ, কোনো দেশ প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর সামরিক হামলার হুমকির মধ্যে থাকতে পারে না।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানে হামলার বিষয়ে একটি আঞ্চলিক মিত্রদেশকে আগাম জানিয়েছে, এই তথ্য এমন এক সময় সামনে এল, যখন যুদ্ধ এড়াতে শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে। শুক্রবার ইস্তাম্বুলে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তবে চাপ ও হুমকির মধ্যে নয়।

আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো বৈঠকের সময়সূচি ঠিক হয়নি। তবে হামলা হলে যুদ্ধের জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে এবং এই যুদ্ধ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। আরাগচি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইরানের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কখনোই কোনো আলোচনার বিষয় হবে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার দাবির জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘দেশ রক্ষার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করব।’

একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ইরান যেমন সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তেমনি ‘ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক আলোচনার’ জন্যও প্রস্তুত।

তথ্যসূত্র: ড্রপ সাইট নিউজ

ইরানে সরকার পরিবর্তনের আশায় ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে ইসরায়েল

কুখ্যাত এপস্টেইন ফাইলে বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি

যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হবে, খামেনির হুঁশিয়ারি

বাজেটে কেন ইরানের চাবাহার বন্দরের জন্য বরাদ্দ রাখল না ভারত

পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৪০ ঘণ্টায় নিহত ১৪৫

অফিসের চাপে প্রাণ গেল কর্মীর, মৃত্যুর ৮ ঘণ্টা পরও এল কাজের নির্দেশ

বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ৭৪ শতাংশ বাড়াল ভারত

নিয়ন্ত্রণবিধি ছাড়াই এআইয়ের সামরিক ব্যবহার চায় পেন্টাগন

মার্কিন হামলার আতঙ্ক, দরজা-জানালা সিল করে খাবার-পানি মজুত করছেন ইরানিরা

যুদ্ধের প্রস্তুতির মধ্যে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের দূত