পরিমিত ঘুমাচ্ছেন, খাবারেরও নেই সমস্যা তবুও যেন ক্লান্তি পিছু ছাড়ে না। বসা থেকে উঠতেই মাথা চক্কর দেওয়ার অনুভূতি হয়। কিছুটা সিঁড়ি বেয়ে উঠলে বা পরিশ্রমের কাজ করলে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়ে যায়। পরিচিত লাগছে এসব সমস্যা? যদি এসব সমস্যায় ভুগে থাকেন তাহলে ভাবনারই বিষয় বলা যায়।
এসব সমস্যার একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আয়রন-ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া বা রক্ত স্বল্পতাকে। আয়রন একটি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, যা মানবদেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খনিজ লোহিত রক্তকণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে শরীরজুড়ে অক্সিজেন পরিবহনে সহায়তা করে। আয়রন শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করে, পেশির কার্যকারিতা উন্নত করে এবং কোষের বৃদ্ধি, ডিএনএ সংশ্লেষণ ও হরমোন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। হিমোগ্লোবিন তৈরিতেও আয়রনের গুরুত্ব অপরিসীম। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলেই আয়রন-ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া তৈরি হয়। নিচে অ্যানিমিয়ার কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষণের কথা উল্লেখ করা হলো—
অ্যানিমিয়ার প্রাথমিক সতর্ক সংকেত, যা জানা জরুরি
১. ক্লান্তি ও দুর্বলতা
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি অনুভব করা অ্যানিমিয়ার অন্যতম সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ। রক্তে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকলে তা পেশি ও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে পারে না। এর ফলে হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার মতো দৈনন্দিন কাজেও অতিরিক্ত অবসাদ দেখা দেয়। অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।
২. ফ্যাকাশে বা হলদেটে ত্বক
ত্বকের স্বাভাবিক রং হারিয়ে ফ্যাকাশে দেখাতে পারে, বিশেষ করে মুখ, হাতের তালু বা চোখের ভেতরের পাতায়। হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার কারণে অক্সিজেন পরিবহন হ্রাস পাওয়াই এর প্রধান কারণ। হালকা ত্বকের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বেশি চোখে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে ত্বকে হালকা হলদেটে আভাও দেখা যেতে পারে, যা জন্ডিসের মতো সংশ্লিষ্ট সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. শ্বাসকষ্ট
অল্প পরিশ্রমেই শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া অ্যানিমিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে দ্রুত শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলে এই সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত ব্যায়াম করার সময় বা সিঁড়ি ভাঙার সময় এটি বেশি অনুভূত হয়, যা অক্সিজেন সরবরাহে হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের অতিরিক্ত চাপের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন এ উপসর্গ উপেক্ষা করলে সময়ের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৪. দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন
অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হলে হৃদ্স্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বা অনিয়মিত হতে পারে, বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের সময়। রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখতে হৃদ্যন্ত্রকে অতিরিক্ত কাজ করতে হওয়ায় বুকে ধড়ফড়ানি, হঠাৎ জোরে স্পন্দন বা স্পন্দন থেমে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।
৫. মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথা
মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছানোর কারণে মাথা হালকা লাগা বা ঘনঘন মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে এই সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মনোযোগের ঘাটতি, মানসিক ঝাপসাভাব (ব্রেন ফগ) বা ভার্টিগোর মতো অনুভূতিও হতে পারে।
৬. হাত ও পা ঠান্ডা থাকা
রক্ত সঞ্চালন দুর্বল হয়ে পড়লে আশপাশের পরিবেশ উষ্ণ হলেও হাত ও পা সব সময় ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। অক্সিজেন-স্বল্প রক্ত শরীরের দূরবর্তী অংশে পৌঁছাতে বাধার মুখে পড়ার কারণেই এমনটি ঘটে।
৭. অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা
আয়রনের ঘাটতির কারণে অনেক সময় ‘পাইকা’ নামে একটি সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেখানে বরফ, মাটি, কাদামাটি বা চক-এর মতো খাদ্যবহির্ভূত জিনিস খাওয়ার অস্বাভাবিক ইচ্ছা তৈরি হয়। এ ধরনের অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা সাধারণত আয়রনের অভাবের সঙ্গেই সম্পর্কিত। এ ছাড়া মুখে ঘা, ঠোঁট ফেটে যাওয়া বা জিহ্বায় ব্যথা থাকাও অ্যানিমিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
৮. ভঙ্গুর নখ ও চুল পড়া
অ্যানিমিয়ায় নখ সহজে ভেঙে যায়, চামচের মতো বাঁকানো আকার নিতে পারে বা নখে দাগ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে চুল অতিরিক্ত পাতলা হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়াও লক্ষ্য করা যায়। বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি যথাযথভাবে না পৌঁছানোর কারণেই এ ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তীব্র ক্লান্তি দেখা দেওয়ার আগেই অনেক সময় এসব দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায়। ক্লান্তির সঙ্গে এসব উপসর্গ একত্রে দেখা গেলে তা অ্যানিমিয়ার জোরালো ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়।