‘শুধুমাত্র শিবিরকে ভালো লাগার কারণে যদি আমায় ছাত্রদল থেকে বহিষ্কারও করে, তাতেও আমার কোনো আফসোস নেই। আমি সর্বদা ইনসাফের পক্ষে’—শেখ তানভীর বারী হামিমের নামে এমন মন্তব্য সম্বলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট পাওয়া গেছে। Shaima Akter নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক রাত ১১টার দিকে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়। আজ ১ মার্চ দুপুর ৩টা পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রায় ১১ হাজার রিয়েকশন পড়েছে। এ ছাড়া ৭৫৪ বার শেয়ার এবং পোস্টটিতে ৫১৯টির বেশি কমেন্ট রয়েছে।
এই দাবিতে পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
শেয়ার করা পোস্টগুলোর কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য ধরে ইতিবাচক কমেন্ট করেছেন। আব্দুর রহিম নামের এক একটি আইডি থেকে লেখা হয়েছে, ‘নাসির ভাই বলেছেন ছাত্রদলে কিছু ভালো লোক আছে, তার মধ্যে হামিম ভাই একজন।’ মো. লোকমান নামের আইডি থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, ‘হামিম ভাই যখন ছাত্রদলের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তখনই তার মুখমণ্ডল দেখে ভালো লেগেছে। উনি কোনো খারাপ মানুষ হতে পারেন না। ভুল পথে ছিলেন, সঠিক পথে চলে আসার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।’
আবার কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন, ‘কথা যদি সত্যিই হয়, তাহলে হামিম ভাই, আপনাকে ইনসাফকামী লোকজনের পক্ষ থেকে অনেক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। আমার মতে, ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার জন্য কোনো দল করার দরকার হয় না।’
Ahmedul Hoque নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আজ ১ মার্চ ভোর ৪টার দিকে ফটোকার্ডটি শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের ইফতার মাহফিলে এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীকে দাওয়াত দেওয়ার কারণে ঢাবি ছাত্রদল নেতা হামিমকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানান হামিম।’
পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ‘আজকে দেখলাম অন্য ঘটনা। শুধুমাত্র ছাত্রশিবিরকে ভালো লাগার কারণে শোকজ করা হয়েছে। হামিম অকপটে বলেন, শুধুমাত্র ছাত্রশিবিরকে ভালো লাগার কারণে যদি আমাকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করে দেয়, তাতেও আমার কোনো আফসোস নেই। আমি সর্বদা ইনসাফের পক্ষে থাকব, ইনশাআল্লাহ।’
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
অনুসন্ধানের শুরুতেই ভাইরাল ফটোকার্ডগুলো যাচাই করে দেখা যায়, ফটোকার্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী হামিমের ছবি, মন্তব্য এবং কার্ডটিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাংগঠনিক মনোগ্রামও রয়েছে। তবে কোথাও ওই মন্তব্যের তথ্যসূত্র উল্লেখ নেই। মনোগ্রামের সূত্র ধরে ছাত্রদলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ পর্যালোচনা করে ভাইরাল ফটোকার্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেতা হামিমকে শোকজ, ভিডিও বার্তায় দিলেন জবাব’ শিরোনামে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী হামিমকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানান। তবে ওই প্রতিবেদনে ভাইরাল ফটোকার্ডে প্রচারিত বক্তব্যের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে ২৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে শেখ তানভীর বারী হামিম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওবার্তা পোস্ট করেন। ভিডিওটি পর্যালোচনা করে আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে একইদিন বিকেল ৩টা ২৪ মিনিটে নিজের পেজে আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘চেইন অব কমান্ড সবক্ষেত্রে বেশি জরুরি। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বেও মুসলমানদের পরাজয়ের কাহিনী আছে, যথাযথভাবে চেইন অব কমান্ড না মানার ফলে। তাই, আমার প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আমাকে যে শোকজ করেছে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ দলের একজন আদর্শিক কর্মী হিসেবে লিখিত জবাব দেব।’
তিনি আরও লেখেন, শোকজপত্র হাতে পাওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভুঁইফোড় মিডিয়া ‘চাঁদাবাজি’ বা ‘শিবির সংশ্লিষ্টতা’র অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করছিল। এ কারণে আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ছাত্রদলের সঙ্গে তাঁর পথচলা, সংগঠনকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য।
পোস্টের শেষে তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি সংগঠনে কেউই চেইন অব কমান্ডের ঊর্ধ্বে নয়। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা মেনেই তিনি সংগঠনকে এগিয়ে নিতে চান। নিজের অনুভূতিকে ইতিবাচকভাবে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করেন।
সিদ্ধান্ত
ভাইরাল ফটোকার্ডটি বানোয়াট। ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামিম এ ধরনের কোনো কথা বলেননি।