একবার নিজের দুঃখের কথা বলেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। তুলি-ক্যানভাসের শিল্পী হলেও তিনি ভাস্কর্যও তৈরি করেছিলেন। কলসি কাঁখে এক বঙ্গ নারীর ভাস্কর্য ছিল সেটি। আট ফুট উঁচু। রাখা হয়েছিল পাবলিক লাইব্রেরির সামনে। একটি প্রদর্শনী হয়েছিল সেখানে। প্রদর্শনী শেষ হলে সেটা কোথায় রাখা হবে, তা ঠিক করতে পারছিল না কেউ। একজন বললেন, ‘এটা শিল্পকলা একাডেমিকে উপহার দেওয়া যায়।’ কামরুল হাসানের তৈরি ভাস্কর্য, যে কেউ লুফে নেবে। কিন্তু ঘটনা ঘটল উল্টো। সে সময় সংস্কৃতিক্ষেত্রের এক দুর্বৃত্ত শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের আসন দখল করেছে। কামরুল হাসানের সঙ্গে কোনো ব্যাপারে তাঁর বিবাদ ছিল। সেই মহাপরিচালক কামরুল হাসানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিল্পকর্মটি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন। এই দুঃখ তাঁকে পীড়িত করেছে।
তবে সব দুঃখ ভুলে যাওয়া একটা ঘটনা ঘটেছে তাঁরই জীবনে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জীবনের প্রধান আগ্রহের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘আমার চিরকালের লালিত ইচ্ছা, হাজার লোকের সামনে যেন আমার মৃত্যু হয় এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত আমি যেন ছবি এঁকে যেতে পারি।’
১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি টিএসসির সড়কদ্বীপে দ্বিতীয় জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে কবিতা শুনতে শুনতে তিনি রবীন্দ্র গোপের ডায়েরিতে এঁকেছিলেন জীবনের সব শেষ স্কেচটি। সভাপতির ভাষণ দেওয়ার পর তিনি মঞ্চ থেকে নেমে আসেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে কুশলবিনিময় করে বসে পড়েন চেয়ারে। খানিক পরেই তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। শেখ হাসিনা নিজের গাড়িতে তুলে কামরুল হাসানকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। হৃদ্রোগ বিভাগের আইসিইউতে কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন কামরুল হাসান। সংস্কৃতিসেবীদের অনেকের সঙ্গে শেখ হাসিনাও ছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
চিরকালের লালিত ইচ্ছা শিল্পী কামরুল হাসানকে প্রতারিত করেনি। তিনি হাজার লোকের সামনেই কাজের মধ্যেই চলে গেলেন। কামরুল হাসানের শেষ কথা ছিল, ‘এই হাসিনা, শোনো…’। সম্ভবত কিছু বলতে চেয়েছিলেন। পারেননি।
সূত্র: ইকবাল হাসান, দূরের মানুষ, কাছের মানুষ, পৃষ্ঠা ১৪-১৫