অভিযোগটা ভয়ানক। শত্রুতার কারণে নাকি স্কুল পুড়েছে। আমরা আগে শুনেছি, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে আগুন ধরে। শুনেছি, গ্যাসের কারণে বিস্ফোরিত হয় ভবন। কিন্তু একটি স্কুলে স্রেফশত্রুতার কারণে আর কেউ আগুন লাগিয়ে দেবে, এটুকুই বুঝি শুনতে বাকি ছিল।
আজকের পত্রিকায় ১০ মার্চ ‘শত্রুতার আগুনে পুড়ল বিদ্যালয়’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটিতে বলা হয়েছে, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার চরমাইজপাড়া বেগম রূপবান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ রকম একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। ৮ মার্চ বিকেলে লাগা আগুনে স্কুলটির চারটি ক্লাসরুমের আসবাব ও শিক্ষাসামগ্রী পুড়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকার। সন্দেহ করা হচ্ছে বিদ্যালয়ের জমি-সংক্রান্ত মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আগুন লাগার ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।
জমিসংক্রান্ত ব্যাপারখানা কী, জানতে হলে আরেকটু ঘাঁটতে হবে স্কুলটির ইতিহাস। ওই এলাকার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব আব্দুল রাশেদ খান ২০০৮ সালে নিজ গ্রামে মায়ের নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে প্রতিবেশী কয়েকজনের চলছিল জমি নিয়ে বিরোধ। একই এলাকার মোনছের আলী বিশ্বাসের সঙ্গে বিদ্যালয়ের জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। প্রতিপক্ষ বিদ্যালয়টি ধ্বংস করতেই তাতে আগুন লাগিয়েছে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।
এখন দেখতে হবে, এই অভিযোগ সত্য কি না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কয়েকজনের নামে অভিযোগ এনেছে। তাঁদের কারও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তাঁরা বলছেন, এই অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁদের ফাঁসানোর জন্য। তাহলে সত্যটা কী?
সত্য যা-ই হোক না কেন, সত্য তো এটাই যে এই ক্লাসরুমগুলোয় যারা পড়তে আসত, তারা এখন বসবে কোথায়? যে পক্ষই আগুন লাগিয়ে থাকুক না কেন, তারা আসলে পুড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষাকে। তাতে কি এই এলাকার শিশুদের খুব লাভ হলো কিংবা তাদের অভিভাবকদের?
বিদ্যালয় বা পাঠাগারকে জ্ঞান অর্জনের আঁতুড়ঘর বলা হয়। বিদ্যালয়ে গিয়ে শুধু যে আমরা বই থেকে শিখি, তা নয়, সেখানে আমরা আমাদের
জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখি। কিন্তু স্কুলে আগুন লাগানোর ঘটনা থেকে কোন ধরনের শিক্ষা পেতে পারে একটি শিশু? ব্যাপারটা কি আগুন লাগানোর আগে একবারও ভেবে দেখেনি এই দুর্বৃত্তের দল?
এমনিতেই গ্রামগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগে বিদ্যালয় নির্মাণ করা হলে তাতে এলাকায় সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাই এ ধরনের ব্যক্তি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো দরকার। কিন্তু আগুনই যদি এ ধরনের উদ্যোগের নিয়তি হয়, তাহলে শিক্ষার হাল কী হবে এখানে?
বিদ্যালয়ে আগুন লাগানোর ঘটনায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। আমরা জানি, কোনো ঘটনাই একপক্ষীয়ভাবে ঘটে না। তাই প্রকৃত ঘটনা যাচাই করার জন্য তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রশাসন আগুন লাগার প্রকৃত ঘটনা উন্মোচন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই অরাজকতার কোনো সুরাহা হবে না।