হোম > ছাপা সংস্করণ

আওয়ামী লীগকে পাস নম্বর দেওয়া যাবে কি

বিভুরঞ্জন সরকার

আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময়ও শেষ হয়ে আসছে। আর এক বছরের কিছু সময় পরই আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখা রাজনৈতিক দলের পাঁচ বছরের কাজের মূল্যায়ন হয় নির্বাচনের মাধ্যমে।

ভোটের মাধ্যমে জনসাধারণ এই মূল্যায়ন করে থাকেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মানুষ আওয়ামী লীগকে পাস নম্বর দিয়েছিল অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। যাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন, তাঁরাও ওই নির্বাচনের পর আবার আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর, নব্বইয়ে এরশাদ পতনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যেআশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, সক্রিয়তা দেখা দিয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী হয়নি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার জন্যই।

মানুষের শক্তির ওপর নির্ভর না করে রাজনীতি কালোটাকা, পেশিশক্তি, আমলাতন্ত্র, ধর্মান্ধসহ নানা রকম অপশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যে রাজনীতিবিমুখ হয়ে উঠেছিলেন, তা কিছুটা কেটেছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর। আওয়ামী লীগের ওপর মানুষ আস্থা রেখেছিল আশা নিয়ে। দিনবদলের যে অঙ্গীকার আওয়ামী লীগ করেছিল, মানুষ তা বিশ্বাস করেছিল। টানা প্রায় ১৪ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পর এখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক যে দিনবদল কতটুকু হলো বা হয়েছে?

প্রতিহিংসার রাজনীতি, ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেশের উপকার, না অপকার করেছে, তা গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণের সময় এখন এসেছে। মানুষের সৃজনশীলতা ও সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারিত না করে একধরনের মূঢ়তাকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দেশ ও জাতির কত বড় ক্ষতি করা হয়েছে, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা যেতে পারে, এ নিয়ে একাধিক গবেষণাও হতে পারে। তবে এখন যেটা জরুরি তা হলো, রাজনীতিকে জনসম্পৃক্ত করার উপায় খুঁজে বের করা। মানুষকে দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনেই জনকল্যাণমুখী রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে।

দেশের রাজনীতির সঠিক ইতিহাস অবিকৃতভাবে তুলে ধরার কাজটি এড়িয়ে গিয়ে কিংবা যখন যেটা সুবিধার মনে হয়, তখন সেই উদাহরণ তুলে ধরে আর যা-ই হোক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মী দল গড়ে তোলা যায় না। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইতিহাসের পাঠ গ্রহণের আগ্রহ কম। সঠিক ঘটনা কিংবা তথ্য না জেনে মনগড়া কথা বলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজিমাত করতে গিয়ে কত বড় ক্ষতি রাজনীতিবিদেরা করেছেন, সেটাও এখন ভাবার বিষয়। ক্রমাগত বিকৃত প্রচার-প্রচারণার ফলে অনেকের মনেই, বিশেষ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যাঁরা জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তি আছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল নিয়ে অনেকের মধ্যেই স্বচ্ছ ধারণার অভাব রয়েছে।

যাঁরা রাজনীতির মাঠে গলাবাজি করেন কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে লিখে বা চাপাবাজি করে উত্তেজনা ছড়ান, তাঁদের কয়জন জানেন যে মাত্র ১৮ ডলারের রিজার্ভ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল?

বিবিসি বাংলার ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রচারিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা চলে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে গিয়েছিল ১৮ ডলার। এ অবস্থায় ভারত বিরাট সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে। সুইডেন ও কানাডা সোনা এবং ডলার দিয়েসহায়তা করেছিল। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম যে রিপোর্ট প্রকাশ করে, তা মোটেও প্রশংসাসূচক ছিল না। তাতে বলা হয়েছিল, ৮০ ভাগ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। একজন কৃষকের গড়পড়তা জমি দেড় একর, তাঁর আছে একটি রুগ্‌ণ গরু, যা দিয়ে হালচাষ হয়। উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁকে চড়া সুদে ধার করতে হয়। জনসন নামে একজন আমেরিকান কূটনীতিক অভিমত প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ বেশি দিন টিকবে না। এটা হবে ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি জাস্ট ফালেন এবং তাঁর একজন সহযোগী লিখেছিলেন, বাংলাদেশের ভূগোল ঠিক আছে, অর্থনীতি ঠিক নেই। এ দেশের অর্থনীতি টেকসই করতে দুই শ বছর সময় লাগবে!

১৮ ডলার রিজার্ভ নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর জীবনকালেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সীমাহীন উদারতা, শাসক হিসেবে কঠোরতা না দেখানোসহ কিছু দুর্বল দিক নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, দেশের মধ্যে শত্রু-মিত্র চিনতে হয়তো তিনি কিছু ভুল করে থাকতে পারেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোন দেশ আমাদের শত্রু আর কারা মিত্র, তা চিহ্নিত করতে তিনি ভুল করেননি। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক আরেক দিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ তিনি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই।’ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করার পরও বঙ্গবন্ধু জোর দিয়েই বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে আলেন্দের পরিণতি বরণ করব, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করব না।’ তিনি তাঁর কথার খেলাপ করেননি।

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু ওই দুর্ভিক্ষের কথা বলে এখনো যাঁরা উল্লাস করেন, তাঁরা এটা বলতে লজ্জা পান যে ওই দুর্ভিক্ষের পেছনে আমেরিকার কারসাজি ছিল। সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে পাটের বস্তা দেওয়ায় ক্রুদ্ধ হয়ে আমেরিকার নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো খাদ্যবোঝাই জাহাজ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কুড়িগ্রামের এক প্রতিবন্ধী নারী বাসন্তীর জাল পরা ছবি পত্রিকায় ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল। পরে এটা জানা গেছে যে ছবিটি কৃত্রিমভাবে তোলা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সরকারকে হেয় করার বদমতলব থেকেই।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন সত্যি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ যখন সফলভাবে প্রায় শেষ করে এনে স্থিতিশীলতা তৈরি করেছিলেন, তখনই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের নিষ্ঠুর বলি হন বঙ্গবন্ধু। এসব তথ্য যে এখনো সবার কাছে পৌঁছানো গেছে, তা নয়। অবশ্য দেশে কিছু মানুষ আছে ও থাকবে যারা সত্য নয়, গুজবেই বেশি আস্থা রাখে বা রাখবে।

পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতি নিয়েও যে বিভ্রান্তি নেই, তা নয়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে রাজনীতির যাত্রামুখ উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে কে বা কারা উপকৃত ও লাভবান হয়েছেন, সে সম্পর্কেও কি দেশের সব মানুষের ধারণা স্বচ্ছ বা পরিষ্কার?

দুই সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সম্পর্কে দুই রকম তথ্য ও ধারণা প্রচার করে প্রকৃতপক্ষে রাজনীতির লাভ না ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়েও আমাদের দেশে নির্মোহ আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ হয়নি।

এরশাদ অবশ্যই খারাপ মানুষ ছিলেন। সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে তিনি বিচারপতি সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্যায়-অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতাকে দমন করার নামে হত্যার পথও বেছে নেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতায় থেকে কেনাবেচার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি গঠন করে রাজনীতিকে কলুষিত করা হয়েছে। ভোট-ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু ইত্যাদির মাধ্যমে নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা হয়েছে। শাসক হিসেবে তিনি নিকৃষ্ট সব কাজের উদাহরণ রেখে গেছেন। কাজেই এরশাদ যে নিন্দিত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হচ্ছে, জিয়াউর রহমান কোন বিবেচনায় প্রশংসিত ও নন্দিত? জিয়া কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশের শাসনক্ষমতা কবজা করেছিলেন? জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক অসততার অভিযোগ হয়তো তেমন নেই। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক অসততার সব ধরনের বীজ রোপিত হয়েছে তাঁর হাত দিয়েই। তিনি দেশের প্রথম সামরিক শাসক। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত জিয়া দালাল আইন প্রত্যাহার করেছেন।

কুখ্যাত জামায়াত নেতা ও পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার সুযোগ করে দিয়েছেন। সমন্বয়ের রাজনীতির নামে রাজাকার-আলবদরদের সমাজে জায়গা করে দিয়ে সমাজে বিভক্তির ধারা স্থায়ী করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী শাহ আজিজুর রহমান, মাওলানা মান্নানকে ক্ষমতার ভাগীদার করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে বিদেশে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন।

নিজের জীবন রক্ষাকারী কর্নেল তাহেরকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে নানা অজুহাতে হত্যা করে সামরিক বাহিনীতে কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন। নিজের ক্ষমতা জায়েজ করার স্বার্থে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের আয়োজন করে ভোট-দুর্নীতির উদ্বোধন করেছেন। অনুগত ছাত্রসংগঠন গড়তে ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। মেধাবী ছাত্রদের হিজবুল বাহারে চড়িয়ে সুযোগসন্ধানী ও বিপথগামী করেছেন। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। দল ভাঙার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করেছেন।

জিয়ার রেখে যাওয়া রাজনীতির জুতা পায়ে দিয়েই এরশাদ পথ চলেছেন। তারপরও দুজনকে নিয়ে রাজনৈতিক মূল্যায়নের হেরফের সুস্থ রাজনৈতিক ধারা তৈরিতে সহায়ক হয়নি। আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক ইতিহাসের সত্যসন্ধানে খুব বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে কি? সব ঝোল নিজেদের পাতে টানার উৎকট প্রবণতা দেখিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে কতটুকু ইতিবাচক অবদান রাখল, সে প্রশ্ন এখন উঠবে। দৃশ্যমান উন্নয়নে পাস নম্বর পেলেও রাজনীতির ধারা পরিবর্তনে আওয়ামী লীগকে উত্তীর্ণ বলা যাচ্ছে কি?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে