সরকারি সূত্র থেকেও বলা হচ্ছে, দেশে কোরবানির পশুর অভাব হবে না এবার। এ পরিস্থিতি অবশ্য কয়েক বছর ধরেই বিরাজমান। বছরের অন্য সময়ে অভাব হলেও হতে পারে; তবে কোরবানির সময়ে গরু-ছাগলের ঘাটতি নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো দেশেই গড়ে ওঠা খামার ও ঘরবাড়িতে পেলেপুষে বাড়িয়ে তোলা পশু। এমন তথ্যও মিলেছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গরু-ছাগলের খামার বাড়ছে ২৫ শতাংশ হারে। নানা পরিস্থিতিতে বেড়ে-কমে এটা যদি আরও কম হারেও বাড়ে, তা মন্দ নয়। আর কৃষকের ঘরে একটা-দুটো করে গরু-ছাগল পালন তো আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। এতে কালক্রমে যুক্ত হয়েছে মুনাফার দৃষ্টিভঙ্গি। আর পশুর খামার প্রতিষ্ঠায় দেশজুড়ে এগিয়ে এসেছেন শিক্ষিত তরুণদের একাংশ। তাঁরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইন্টারনেটেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন তাঁরা। কোত্থেকে কী সহায়তা পাওয়া যায়, সেটাও অর্জন করতে চাইছেন।
ভারত থেকে গরু আসা বন্ধের পর এবং সরকারও গরু আসতে না দেওয়ার মতো অবস্থান নেওয়ার ফলে দেশে এ খাতে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা গ্রহণে তরুণ উদ্যোক্তারাই ছিলেন অগ্রগামী। তাঁদের দেখানো পথে বড় ব্যবসায়ীরাও ক্রমে পশুর খামার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসছেন। তাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে বৈকি। বহু পরিবার জড়িয়ে পড়েছে পশুপালন খাতে এবং তারা এটাকে নিয়েছে ব্যবসা হিসেবেই। তারা প্রধানত কোরবানির সময়টাকে টার্গেট করে বিনিয়োগ করছে। বিভিন্ন জাতের, এমনকি মিশ্র জাতের পশুপালনের প্রবণতা বাড়ছে। কম সময়ে ও কম বিনিয়োগে বেশি মাংস তৈরি হবে, এমন জাতের গরু-ছাগল পালনের প্রবণতা বেড়ে উঠতে দেখা যায়। প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরাও ভূমিকা রাখছেন এ ক্ষেত্রে।
বেশি মাংস উৎপাদন করতে গিয়ে আবার দুধ উৎপাদন যাতে কমে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে। গরু-ছাগলের পাশাপাশি ভেড়া, মহিষ এবং হালে গাড়ল, এমনকি গয়াল পালনের প্রবণতা দেখা যায়। এ খাতে রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চোরাই পথে গরু আসা প্রায় বন্ধ হওয়ায় এ ক্ষেত্রেও নাকি তৈরি হয়েছে সুবিধাজনক পরিস্থিতি। পশুপালনে অল্প সুদে ঋণ জোগাচ্ছে সরকার। খাতটিতে মনিটরিং বাড়ানো হচ্ছে। এই সবকিছু মিলিয়ে পশুপালন খাতে যে একটা সাফল্য এসেছে, তা কোরবানির ঈদ এগিয়ে আসার সময়টায় প্রাপ্ত খবরে বেশ বোঝা যায়।
খারাপ খবরও আছে। যে সংখ্যক পশু কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে বাজারে আনা হয়, তার একটা অংশ কিন্তু অবিক্রীত থাকছে। চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন অবশ্য ক্রেতার জন্য ভালো। কিন্তু পশুপালনকারীর স্বার্থও দেখতে হবে। সীমাহীন পরিশ্রম আর অর্থ বিনিয়োগ করে কেউ যদি লাভজনক দামে পশু বিক্রি করতে না পারেন, তবে বিষয়টি হতাশার। পরবর্তী উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মাঝে দু-এক বছর পশু কোরবানি কমে যাওয়ার খবরও মিলেছিল। কোরবানি অব্যাহতভাবে বাড়বে, এমন কথা তো নেই। ক্রেতার আর্থিক অবস্থার ওপর পশু কোরবানির হ্রাস-বৃদ্ধি অবশ্যই নির্ভরশীল। গরু-ছাগলের দামও এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য। অনেকে বলছেন, এবারও পশু কোরবানি কম হবে। কেননা বিপুলসংখ্যক পরিবারকে লড়তে হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে। অনেকে আবার কাজ হারিয়েছেন; কাজ থাকলেও অনেকের আয় গেছে কমে। তাঁদের জীবনে সংকট গভীরতর। ধর্মও তো বলেনি, ধারকর্জ করে পশু কোরবানি দেওয়ার কথা। এদিকে কোরবানির পশুর দাম বেড়ে ওঠার প্রবণতা স্পষ্ট। গরু-ছাগলের মাংসের চড়া দামে ইতিমধ্যেই সেটা প্রতিফলিত। শহরাঞ্চলে কেজিপ্রতি ৮০০ টাকার নিচে মানসম্মত গোমাংস মিলছে না। ছাগলের মাংসের দাম ১০৫০-১১০০ টাকা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মহিষের মাংস পাওয়া কঠিন এবং পেলেও এর দাম গোমাংসের সমান। কিছু হিমায়িত মহিষের মাংস আমদানিও হয়ে থাকে। কিছু আসে চোরাই পথে। কোরবানির হাটে কিছু মহিষও উঠতে দেখা যায়। কিছু ভেড়া ও গাড়ল। অর্থসংকটে থাকা ক্রেতারা কি এগুলো কিনতে পারবেন অপেক্ষাকৃত কমে? মাঝে কিছুদিন উট আসত কোরবানির হাটে। নানা কারণে এর আকর্ষণ বোধ হয় কমেছে।
যা হোক, গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়লেও এবং এতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও এর দাম বৃদ্ধির বিষয়টি কিন্তু উদ্বেগজনক। যাঁরা ধর্মীয় নির্দেশনা মেনে এবং দীর্ঘ চর্চার অংশ হিসেবে পশু কোরবানি দেন, তাঁরা এ সময়টায় অবশ্য দামের দিকে খুব একটা তাকান না। যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, তাঁরা তো ঈদে বোনাসও পেয়ে থাকেন। পশু কোরবানির জন্য সঞ্চয়ও করে স্বল্প আয়ের মানুষ। বিদেশে আমাদের শ্রমবাজারগুলো থেকে এ সময়ে এসে থাকে রেমিট্যান্স। কোরবানির ঈদ টার্গেট করে গরু-ছাগল পালনকারী এবং এর বেচাবিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রেমিট্যান্সের সুফলও পেয়ে থাকেন। কোরবানি উপলক্ষে বেশি করে রেমিট্যান্স এলে আমাদের সংকটে থাকা রিজার্ভও একটু চাঙা হবে। তবে এটা আসতে হবে বিধিবদ্ধ উপায়ে। সেভাবে না এলে প্রবাসীদের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোয় অর্থ আসবে হুন্ডিতে। সেটাও বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিতে রাখবে ভূমিকা। হাটে তোলা গরু-ছাগল বিক্রিতেও এর সরাসরি প্রভাব থাকবে। যেসব অঞ্চল রেমিট্যান্সে থইথই করে, সেখানে কোরবানির পশু বিক্রিও হয় বেশি। আর যেখানে সচ্ছল মানুষজন বেশি থাকেন। এ কারণে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় পশু কোরবানি হয় অনেক বেশি।
গরু-ছাগলের দাম এ সময়টায় বেশি থাকে চাহিদা একযোগে বেড়ে যাওয়ার কারণে। গোখাদ্যের দামও আলাদা করে বাড়ে। এটাও হয়ে ওঠে একটা ব্যবসা। কত লোক শুধু এ সময়টায় এক অঞ্চল থেকে দেশের আরেক অঞ্চলে যায় গরু-ছাগল বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে! পশু কোরবানি বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কসাইয়ের চাহিদাও। শুধু এ সময়ে মাংস কাটাকুটিতে জড়ায় এক বিরাট জনগোষ্ঠী। তাদের কাজের সুযোগ আরও বাড়বে—পশু কোরবানি বাড়লে। সেটা যদি গরু-ছাগলের বেড়ে ওঠা দামের কারণে না ঘটে এবং সঙ্গে মানুষের উপার্জন কমে যাওয়ার কারণে, তবে দুর্ভাগ্যজনক। আয় তো চট করে বাড়ানো যাবে না। গরু-ছাগলের দামও দ্রুত কমানোর সুযোগ নেই। তবে কখনো কখনো দেখা যায়, চাহিদা অনেক কমে যাওয়ায় কম দামে, এমনকি লোকসানে কোরবানির পশু বেচে দিচ্ছেন ব্যাপারীরা। শহর-বন্দরে যাঁরা এ সময়ে গরু-ছাগল নিয়ে আসেন, তাঁদের সিংহভাগ কিন্তু ব্যবসায়ী। তাঁরা উৎপাদক নন।
তবে আজকাল অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি বেড়েছে। খামার থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে গরু-ছাগল। আগাম কিনে অনেকে রেখে দিচ্ছেন খামারেই। কেউ কেউ কৃষক পরিবারকে দিয়ে চুক্তিতে মোটাতাজা করিয়ে নিচ্ছেন কোরবানির পশু। তবে এখনো সিংহভাগ ক্রেতা হাট থেকেই গরু-ছাগল কেনেন দরাদরি করে। এটা তো আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ। এ অবস্থায় দ্রুত না হলেও সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করতে হবে কম খরচে পশুপালনের কাজটি নিশ্চিত করতে। কী কী কারণে এ খাতে ব্যয় বেড়ে চলেছে, সেটা খতিয়ে দেখা আমাদের কর্তব্য। কম ব্যয়ে পশুপালন করতে না পারলে খামারি বা কৃষক সহনীয় দামে বিক্রি করবেন কীভাবে? মাংসের দামই বা কমবে কীভাবে? গোমাংসের দাম লাফিয়ে বেড়েছে এবং শুধু পাশের দেশ নয়, ধনী দেশগুলোর তুলনায়ও দাম এখানে বেশি। গেল রমজানের আগে এফবিসিসিআইর সভাপতিও এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে প্রয়োজনে মাংস আমদানি করতে বলেছিলেন। কিছু মাংস তো আমদানি হচ্ছে এবং বেশ কম দামে। দেশে পশুপালন খাতে ব্যয় না কমাতে পারলে, স্বাভাবিক দামে গরু-ছাগল সরবরাহ করা না গেলে মাংস আমদানি বাড়ানোর দাবিটা কিন্তু জোরদার হয়ে উঠবে। গরু-ছাগল ও মাংসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে বাজারে সুশাসনের সংকটও যে দায়ী, সেটা সবাই জানি।
কোরবানির ঈদটা ভালোয় ভালোয় পার হয়ে যাক। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট থাকুক পশুর বেচাকেনা নিয়ে। বলা হয়েছে, এবার রাস্তা থেকেও গরু-ছাগল বেচাকেনা করা যাবে। হাটে নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করা চলবে না। সে ক্ষেত্রে ৯৯৯-এ কল করলে মিলবে পুলিশি সহায়তা। এসব খবর কিছুটা হলেও স্বস্তির। তবে আসল স্বস্তি মিলবে যদি পশুপালন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার জায়গাগুলো সরকার উদ্যোগী হয়ে ‘অ্যাড্রেস’ করে। শুধু কোরবানির সময় তো নয়; বছরব্যাপী পশুর স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। রমজানে এবং শীতকালসহ বিভিন্ন উপলক্ষে গরু-ছাগলের বাড়তি চাহিদাও কিন্তু সৃষ্টি হয়। আর এর বাজার ভবিষ্যতে আরও বড়ই হবে এবং আমাদের তো চোরাই পথে আসা গরুর ওপর নির্ভর করে থাকার বাস্তবতায় ফিরে যাওয়া চলবে না। তার সুযোগও খুব সীমিত। গোমাংস আমদানির ওপর নির্ভরতাও ইতিমধ্যে বিকশিত হয়ে ওঠা দেশের পশুপালন খাতকে সংকটে ফেলবে। সেটা এ খাতে আত্মকর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থান দুইয়ের জন্যই খারাপ।
লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক