লাতিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে যুদ্ধটা ঘটেনি। এমনকি মেসি আর নেইমারও চুলোচুলি করেননি। ক্লাব ফুটবলে ফ্রান্সের পিএসজি নামে একই দলের সতীর্থ মেসি আর নেইমারের মধ্যে সম্পর্ক খুবই মধুর। কিন্তু আমাদের এই বিচিত্র দেশে কত ধরনের বিচিত্র ঘটনা যে ঘটে, তার ইয়ত্তা নেই। মেসি আর নেইমার-সমর্থকেরা যেকোনো মুহূর্তে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত।
মনিতে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ হয়, তা প্রকট হয়ে ওঠে কখনো কখনো। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা দুজন ব্রাজিল সমর্থকের ওপর চড়াও হয়ে ওঠার যে খবরটি বেরিয়েছে আজকের পত্রিকায়, সেটা প্রমাণ করে যে মিছিমিছি আমরা যেকোনো মুহূর্তে কতটা কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হয়ে উঠতে পারি।
রাজশাহীর বিলশিমলা এলাকাটি একটি ‘ঐতিহাসিক’ মারপিটের ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল। আগে রেষারেষি থাকুক আর না-ই থাকুক, ব্রাজিল হেরে বিদায় নেওয়ার পর আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ব্রাজিলের দুজন সমর্থককে পিটিয়েছেন, সেটাই সবচেয়ে বড় সত্য এবং সেই সঙ্গে এটাও বলা দরকার, একই ঘটনা ঘটতে পারত বিপরীতভাবে বিলশিমলা অথবা দেশের যেকোনো জায়গায়, যেখানে ব্রাজিলের জায়গায় মার খেতে পারতেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, মেসি নিজেকে যতটা আর্জেন্টাইন বলে মনে করেন কিংবা নেইমার নিজেকে যতটা ব্রাজিলিয়ান বলে মনে করেন, বাংলাদেশে তাঁদের সমর্থকেরা নিজেদের তাঁদের চেয়েও অনেক বেশি আর্জেন্টাইন বা ব্রাজিলিয়ান হিসেবে মনে করে থাকেন। তাই মেসি আর নেইমারের মধ্যে মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়েও লাতিন আমেরিকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বাংলাদেশে সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দল দুটির পক্ষ নিয়ে যা খুশি তা-ই করার লাইসেন্সের অধিকারী হওয়া যায়।
খেলাধুলা সব সময় মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে। তাকে ইতিবাচক মানসিকতার দিকে নিয়ে যায়। চার বছর পর পর যখন ফুটবল বিশ্বকাপ হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে মানুষের মনে। কোনো সন্দেহ নেই, এটা সত্যিই ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। রক্তের ভেতরে যে নাচন সৃষ্টি করে বিশ্বকাপ ফুটবল, সেটা সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক। পৃথিবীর বহু দেশেই ফুটবলের ফ্যানাটিক সমর্থকের দেখা মেলে, কিন্তু এটাও বিবেচ্য যে সেই দেশগুলোতেই এ রকম উন্মত্ত দর্শকের দেখা মেলে, যে দেশগুলো ফুটবল খেলছে বিশ্বকাপে। আমাদের দেশ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না, অথচ ছাগলের ৩ নম্বর বাচ্চার মতো কোনো কিছু বুঝে না বুঝে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য নিজেদের মধ্যে মারপিট করে।
পৃথিবীর ফুটবল অনেক দূর এগিয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা এখন উঠে আসছে ভালো দলের তালিকায়। সর্বশেষ বিস্ময় হিসেবে মরক্কো যে খেলা খেলছে, তাতে বিশ্ব ফুটবলে তাদের একটি পোক্ত অবস্থান ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমর্থকেরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মধ্যে যে মধু পেয়েছেন, সেই মধুকে তেতো করে গিলে ফেলার প্রতিযোগিতাকেই জিইয়ে রাখছে মাত্র।