এখন প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকার কারণে দেখা যাচ্ছে আমরা সাধারণ মানুষ এই একই ধরনের তথ্য সহজ উপায়ে, স্বল্প খরচে, অল্প সময়ে, সেটা তৈরি করে ব্লগ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে একে অপরকে শেয়ার করছি এবং এই শেয়ার ভ্যালু থেকে শিখছি, জানছি, অনুপ্রাণিত হচ্ছি, অনুপ্রাণিত করছি প্রযুক্তির ব্যবহার গণমাধ্যমে অল্প সময়ে সহজ থেকে সহজতর হওয়ার কারণে মিডিয়া, ফিল্ম ও সংবাদপত্রের চাহিদা গণসমাজে কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ব্লগ ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের সর্বাঙ্গীণ চাহিদা মেটাতে জগৎজুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। মিডিয়া, ফিল্ম ও নিউজ এখন ব্লগ এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে তুলে ধরে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। তবে যদি মিডিয়া টেকনোলজির অলৌকিক পরিবর্তন না আনা হয়, তবে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে। কী কারণে এমনটি? প্রধান এবং প্রথম কারণ মিডিয়া টেকনোলজির জটিলতা। আসুন, খোলামেলা আলোচনার মধ্য দিয়ে আমার যুক্তির বৈধতা খোঁজা যাক।
আমি প্রায়ই বলি যেমন ‘লোকাল কনসার্ন গ্লোবাল সলিউশন।’ একটি সমস্যা হুট করে আসে এবং সেটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে শুরু হয়। যেমন করোনা মহামারি প্রথম শুরু হলো উহান নামে চীনের একটি শহরে। সেই সমস্যা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমে উহান সমস্যা ‘লোকাল কনসার্ন’ হলেও কিন্তু সেটা বিশ্ব সমস্যা হয়ে আমাদের মধ্যে চাপের সৃষ্টি করে, যার ফলে আমরা বাধ্য হই এর সমাধান খুঁজতে। মিডিয়া টেকনোলজি মানুষের চাহিদা পূরণে কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে প্রযুক্তি সবার হাতের মুঠোয় থাকার কারণে মানুষ নিজেই তার সঠিক ব্যবহার করে মনের বাসনা পূরণ করতে শুরু করেছে। এখন এই শুরুটা নকল বা কপি করার মধ্য দিয়ে হয়েছে।
আমরা বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখতে পারি। যেমন দেখে শেখা এবং জেনে শেখা বলে একটা কথা আছে। পৃথিবীর ইতিহাসেও এক দেশের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা থেকে অন্য দেশের মানুষ শিখেছে বলে এগিয়েও গেছে। সময় এসেছে ভেবে দেখার যে নকল করা পণ্য থেকে প্রেরণা নিয়ে দেশে সৃজনশীলতার নতুন এক ঢেউ ওঠানো যায় কি না? তাই নকলের ওপর কিছু আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
নকল কী? কেন আমরা নকল করি? নকল না করলে এর বিপরীত কি অন্য কোনো সমাধান আছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করা’র কথা বলা হয়। কিন্তু সে জ্ঞান হতে পারে ‘কু’ বা ‘সু’ শিক্ষা। ইন্টারনেটের এই যুগে সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই কোনো কিছু উদ্ভাবন করে তা কপিরাইটের বন্ধনে বেঁধে রাখা কঠিন ব্যাপার। জন্মের শুরুতেই আমরা যা দেখছি বা শুনছি, তা-ই শিখছি বা অনুকরণ করছি। অন্যভাবে বলতে পারি, কপি করছি বা নকল করছি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। তাই বলা যেতে পারে, নকল করা বা কপি করা, এটা কোনো নতুন সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, নকল যদি নিজের বা সমাজের জন্য কোনো ভালো ফল ফলাতে না পারে, তাহলে সে নকল অকল্যাণকর। নকল যদি নিম্নমানসম্পন্ন হয়, তাহলে তার পরিণতি হবে বেকারত্ব আর জীবন হবে অন্ধকারময়। জীবনকে বড় করে ভাবতে এবং শিখতে হলে দরকার ভালোভাবে শেখা, আর তার জন্য দরকার সৃজনশীল উপায়ে নকল করা এবং শেখা। নকল বা কপি করার সঙ্গে শিক্ষার কী সম্পর্ক থাকতে পারে, তার ওপর একটু গুরুত্ব দিতে চাই দুটো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে।
জাপানিরা খুব দেশ-বিদেশ ঘোরাঘুরি করে এবং তাদের সঙ্গে সব সময় ক্যামেরা থাকে, তারা যা দেখতে বা জানতে চায়, তার ওপর সব সময় ছবি তোলে। তারা কপি করতে বেশ পারদর্শী, তা আমরা জানি। তবে তারা শুধু কপি নয়, সঙ্গে কিছু নতুনত্ব সংযোজন করার চেষ্টাও করে। তাদের এই কপি করার মধ্যে রয়েছে জানার জন্য শেখা এবং তাদের থেকেই শেখা, যারা জানে। এখন এই জানা-অজানার মাঝে আমার জীবনের নকলের বা কপি করার ওপর কিছু অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি।
২০০১-০২ সালে আমাকে জাপানে পাঠানো হয় দুটো কোম্পানি পরিদর্শন করতে। একটা তোশিবা কম্পিউটার কোম্পানি, আরেকটি টয়োটা গাড়ি কোম্পানি; যদিও আমি তখন কাজ করি ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির ওপর। কেন আমাকে পাঠানো হলো ওই দুটি ভিন্ন ধরনের কোম্পানিতে? কারণ ছিল একটাই, যারা জানে তাদের থেকে শেখা। মিস্টার টয়োটার সঙ্গে তাঁর প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি দেখা। কথা হতেই তিনি বলেছিলেন, ‘দয়া করে এখানে থাকুন আর ভালো করে দেখুন, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি।’ তিনি পাঁচ মিনিট পরে ফিরেছিলেন এবং সেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে যা আমি দেখেছিলাম, তার ওপর কথা বলেছিলেন দীর্ঘ তিন দিন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কী কী দেখলাম? কী না দেখলাম? যা দেখলাম তা কেন দেখলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। গাড়ির জগতে কম খরচে ভালো কোয়ালিটিসম্পন্ন গাড়ি তৈরি করা আবশ্যক। তাই ‘টয়োটা’ কাইজেন তত্ত্বের আলোকে পর্যবেক্ষণ করে উৎপাদনের প্রতিটি পদক্ষেপ। কাইজেন হলো নিরন্তর উন্নতি করা, পদ্ধতিগতভাবে দীর্ঘ মেয়াদে কাজের এমন এক ধারা, যার মাধ্যমে কর্মপদ্ধতিতে সামান্য খুঁটিনাটি পরিবর্তনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে দক্ষতা ও মানের উৎকর্ষ সাধন করা যায়। আমাকে পাঠানো হয়েছিল এই কাইজেন তত্ত্ব শিখে নকল বা কপি করে সেটাকে ওষুধশিল্পে কাজে লাগানোর জন্য। তোশিবা থেকে শিখেছিলাম, নকল বা কপি করেছিলাম তাদের কার্যকর উপায় এবং সঙ্গে দক্ষ পরিচালনব্যবস্থা।
পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে পাঠানো হলো আমাকে হল্যান্ডে। কারণ ছিল একটাই, নকল বা কপি করা, মনুষ্যত্বের সঙ্গে তাদের শিল্প ব্যবস্থাপনার সম্পর্কটি ভালো করে জানা। হল্যান্ড একটি মজার দেশ, যাদের নৈতিক মূল্যবোধ পৃথিবীর মধ্যে খুব উন্নতমানের। তাদের শিক্ষার হার শতভাগ। তাদের ভালো-মন্দের দায়িত্ব তারা নিজেরাই বেশির ভাগ সময় নির্ধারণ করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তাদের অপরাধ থেকে শুরু করে সব ধরনের খারাপ অভ্যাসের পরিমাণ কম। যা শিখলাম, একেবারে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম, কোনো ফাঁকিজুকি নেই। কোনো গোপন সূত্র নয়, প্রস্তুতি ও পরিশ্রম এবং যারা শেখে, তাদের কাছ থেকে শেখাই তাদের চাবিকাঠি।
এখন প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকার কারণে দেখা যাচ্ছে আমরা সাধারণ মানুষ এই একই ধরনের তথ্য সহজ উপায়ে, স্বল্প খরচে, অল্প সময়ে, সেটা তৈরি করে ব্লগ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে একে অপরকে শেয়ার করছি এবং এই শেয়ার ভ্যালু থেকে শিখছি, জানছি, অনুপ্রাণিত হচ্ছি, অনুপ্রাণিত করছি। বিশ্বের সর্বত্র ইদানীং ব্লগারদের ধরে ধরে টিভির পর্দায় এনে তাঁদের ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে। এতে করে তাঁদের আরও জনপ্রিয় করতে সাহায্য করছে মিডিয়া, ফিল্ম এবং নিউজ টেকনোলজি। কারণ তাঁদের যে অনুসারী রয়েছে তা হয়তো সেই মিডিয়া টেকনোলজির নেই। সে ক্ষেত্রে এসব ব্লগারের সুবাদে মিডিয়াগুলোও নতুন দর্শক জোগাড় করছে। বাংলাদেশে ইদানীং এমনটি সবার নজর যে কাড়েনি, তা বললে ভুল হবে কি?
তাহলে গণমাধ্যম থেকে আমরা কী শিখছি? যত সহজ, তত ভালো। কারণ, আমরা সহজ এবং দ্রুততার সঙ্গে সবকিছু অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পছন্দ করি।
একটি গল্প দিয়ে লেখার সমাপ্তি ঘটাই। টেলিফোন কোম্পানি এরিকসন ও নকিয়া একই সময়কার প্রযুক্তি। এরিকসন বিশাল প্রযুক্তির গুরু হওয়া সত্ত্বেও নকিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভালো করতে পারেনি। কারণ, এরিকসনের টেলিফোনে যে জটিলতা ছিল (যা তাদের স্লোগানেই প্রকাশ পায় ‘মেক ইয়োরসেলফ হার্ড’), তাতে করে গ্রাহকেরা সেটাকে সহজভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। অন্যদিকে নকিয়া (তার স্লোগান ‘কানেকটিং পিপল’) সহজেই গ্রাহকদের মন জয় করে নেয়। তাহলে বলা যেতে পারে, টেকনোলজি উইল নেভার বি দ্য সেইম, ইটস চেঞ্জিং, সো লেট আস বি অ্যাগ্রিয়েবল টু সে দ্যাট সিমপ্লিসিটি ইজ দ্য বেস্ট।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন