সুদখোরদের অত্যাচার আজও থামেনি। আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে এখন আর ব্যক্তি পর্যায়ে টাকার বিনিময়ে সুদ গ্রহণের নিয়ম নেই। সিনেমা, গল্প, উপন্যাসে আমরা একসময়কার সুদখোর
মহাজনদের অত্যাচারের কাহিনি পড়েছি। এসব কাহিনি পড়ে মন বিষণ্ন হয়ে গেছে। কল্পনার মধ্যে না থাকলেও ইতিহাস বলে, একসময় সুদখোরেরা সময়মতো টাকা তুলতে না পারলে গ্রহীতাকে এভাবেই অত্যাচার করত।
কথায় আছে, সময় অতীত হয়ে গেলেও ঘটনার রেশ বর্তমানেও মাঝেমধ্যে আছড়ে পড়ে। এই আধুনিক যুগেও যে মহাজনি ব্যবস্থার রেশ রয়ে গেছে, তার প্রমাণ আমরা দেখলাম আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে। এ ঘটনাটি কিছুটা হলেও আমাদের মহাজনি ব্যবস্থার কাছে ফিরে নিয়ে যাবে।
সাত মাস আগে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার চারিগাঁও গ্রামের ভুক্তভোগী আওলাদ হোসেন একই গ্রামের মানিক হাওলাদারের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেন প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা সুদ দেওয়ার চুক্তিতে। তিন মাস পর মূল টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু এক মাসের মাথায় সুদসহ মূল টাকা ফেরত চান মানিক হাওলাদার। টাকা না দিলে বাড়িঘরে হামলার হুমকি দেন। গত ১২ জানুয়ারি মানিক ও তাঁর লোকজন আওলাদের বসতঘরে হামলা চালিয়ে লুট করে নিয়ে যায় ঘরে থাকা ফ্রিজ, টিভি, শোকেস, আলমারি, আলনা, খানাডুলি, দুটি খাট, দুটি চৌকি, গ্যাসের সিলিন্ডার, চেয়ারটেবিল, হাঁড়ি-পাতিলসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। লুটপাটে বাধা দিলে আওলাদ ও তাঁর স্ত্রী দিপা বেগমকে মারধর করা হয়। এসব করেই তাঁর লোকজন ক্ষান্ত হয়নি, নির্দয় ঘটনা হলো গোসলখানা ভাঙচুর করে ইট খুলে নিয়ে যাওয়াও হয়েছে।
ভুক্তভোগী আওলাদের দাবি, মানিক হাওলাদার ৮০ হাজার টাকার বিপরীতে প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।
না বোঝার কোনো কারণ নেই, আমাদের বন্ধনগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে পারস্পরিক সমস্যা-সংকট, সুখ-দুঃখে মানুষ মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর যে কথা বলা হয়, বাস্তব জীবনে তার অভাব দেখা যাচ্ছে। চারপাশের দৃশ্যপট যেন নির্মম ও অমানবিক হয়ে উঠছে। প্রেম-প্রীতি, মায়া-মমতা, দরদ-ভালোবাসা দিন দিন মানুষের মন থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। অমানবিকতার দাপটে মানবিক আচরণ যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
মানুষ হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক। এটা যে শুধু আমাদের দেশে ঘটছে, তা নয়। নিজের চিন্তায় মগ্ন থেকে অন্যের সুখ-দুঃখ তার কাছে ভাবার বিষয় হয়ে ওঠে না। এই স্বার্থান্বেষী চিন্তাধারা এখন মানুষকে মানুষের প্রকৃত রূপ থেকে ক্রমেই আলাদা করে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী আওলাদ হোসেনের স্ত্রী দিপা বেগম বাদী হয়ে মুন্সিগঞ্জ আদালতে মামলা করেছেন। মুন্সিগঞ্জ আমলি আদালত-৬-এর বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।
তদন্ত শেষ হলে বিচারের মাধ্যমে আসল অপরাধী যেন যথার্থ শাস্তি পায়, আমরা সেটাই চাই।