হোম > ছাপা সংস্করণ

সব জায়গায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে

মাসুদ রানা

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ ইন ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস, কালেকটেড পেপারস অন ইকোনমিক ইস্যুজসহ অর্থনীতির ওপর রচিত তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। ‘গভর্নরের স্মৃতিকথা’ নামে তাঁর একটি আত্মস্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশে এর প্রভাব, ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা, খেলাপি ঋণ এবং রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি বিষয়ে আজকের পত্রিকার মাসুদ রানার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

আজকের পত্রিকা: দেশের অর্থনীতি বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগছে। বাড়ছে খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ আদায়ও তেমন হচ্ছে না। এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কারণ কী? 
সালেহউদ্দিন আহমেদ: এর মূল কারণ হলো, প্রথমত, প্রবাসী আয় তথা রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে। আমাদের এমনিতেই রপ্তানির আয়ের পরিমাণ কম। কোভিড পরিস্থিতির পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পায়নি। সেই সঙ্গে আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। আর একটা বিষয় হলো, বিদেশে অর্থ পাচার অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

কালোবাজারিরা বিভিন্ন চ্যানেলে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। সে কারণে সার্বিকভাবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অনেক বেড়ে গেছে। আর খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো, এ বিষয়ে তদারকি করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর পড়ে। তাদের দক্ষতা, জবাবদিহি, মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনা ভালো না। আর সেই সঙ্গে আছে এসব ব্যাংকে সুশাসনের অভাব। সুশাসনের অভাব বলতে বোঝাচ্ছি, পাবলিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিচালকেরা খবরদারি করেন। এর সঙ্গে আছে রাজনৈতিক ও সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপার-স্যাপার। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেন না। আবার ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যানরা নিয়োগ যে পান, তাঁরা সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। তাঁদের মধ্যে সেভাবে জবাবদিহির ব্যাপার দেখা যায় না। সে কারণে ব্যাংক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলভাবে পরিচালিত হতে দেখা যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা আছে। এসব অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো ধরনের শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায় না। খেলাপি ঋণ আদায়েও ব্যাংকগুলোর ঘাটতি আছে। আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যাঁরা ফেরত দেন না, তাঁরা অনেক ক্ষমতাবান। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাঁদের সেভাবে চাপ দিতে পারে না। ঋণ আদায়ের জন্য খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়। রাজনৈতিক চাপের কারণে আদালত বা বিচারকেরা সেভাবে মামলার কাজ এগিয়ে নিতে পারেন না। তাই বলতে হবে, সব ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আছে।সব মিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে সমস্যা ও সংকট প্রকটভাবে আছে। 

আজকের পত্রিকা: রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির কী কারণ থাকতে পারে?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির কারণ আমার কাছে মনে হয়, এনবিআর এবং সরকারের ব্যর্থতা আছে। তারা যথার্থভাবে রাজস্ব আদায় করে না। শুধু তারা কথাই বলে যাচ্ছে। প্রথমত, এনবিআর নতুন করে রাজস্ব আদায়যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করছে না। এনবিআর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল ও সন্তোষজনক নয়। নতুন নতুন সেক্টর থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ডেটাবেইস আপডেট করার ঘাটতি আছে। এ কারণে নানা ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। আর একটা ব্যাপার হলো, ব্যাংকে যেসব হিসাবের ক্ষেত্রে ট্যাক্স যুক্ত করা হয়েছে, সেখান থেকে সহজে এনবিআর রাজস্ব আদায় করতে পারে না। আর প্রত্যক্ষ বা যেটাকে ইনকাম ট্যাক্স বলা হয়, যেটা থেকে বেশি টাকা আদায় হওয়ার কথা, সেই সবও সঠিকভাবে আদায় করা হয় না। সব মিলিয়ে অদক্ষতা, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্র বৃদ্ধি না করার বিষয়গুলো আছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী আছেন, তাঁদের ট্যাক্সের আওতায় আনা হচ্ছে না। ঢাকার মধ্যেও বহু লোক এবং অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ট্যাক্সের আওতায় নেই। এসব কিন্তু কোনো কঠিন কাজ না। শুধু একটু পরিকল্পনা ও জরিপ করে ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা দরকার। বাংলাদেশে এখনো রাজস্ব আদায়ের হার হচ্ছে ৭ থেকে ৮ শতাংশ আর নেপালের রাজস্ব আদায়ের হার হচ্ছে ২২ শতাংশ। আইএমএফ শর্ত দেওয়ার পরেও রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ছে না। 

আজকের পত্রিকা: সরকারও তো অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থে কিছু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিকে রাজস্ব থেকে মুক্তি দিচ্ছে? 
সালেহউদ্দিন আহমেদ: ব্যক্তির যে ইনকাম ট্যাক্স তাঁরা তো সেটা দেন, আবার অনেক ব্যবসায়ীও তাঁদের ট্যাক্স দিয়ে থাকেন। নতুন যে অনেক ব্যবসায়ী আছেন, তাঁদের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না। আবার অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীর বছর বছর ধরে আয় বাড়ছে, কিন্তু তাঁদের তো ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়ছে না। এটা তো একটা বড় সমস্যা। নিয়ম হলো, আয় যত বাড়বে, তাঁর ট্যাক্সও সেই পরিমাণে বাড়বে। কিন্তু অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা যথার্থভাবে আদায় করা হয় না। আর সরকার কিছু ক্ষেত্রে বড় বড় শিল্পপতির রাজস্ব আদায় করছে না মূলত দলীয় স্বার্থে। আসলে এটা করা উচিত নয়। সবার আগে দেশের স্বার্থ দেখাটা উচিত। 

আজকের পত্রিকা: কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে? 
সালেহউদ্দিন আহমেদ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ হলো মনিটরিং সিস্টেমকে উন্নত করা। এ ক্ষেত্রে আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা আছে। তারা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে ফিন্যান্স বিভাগের মাধ্যমে। অন্যান্য ব্যাংকের এমডি, পরিচালক নিয়োগ থেকে অনেক কাজ তারা সরাসরি করতে পারে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দুই ধরনের ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে যদি দুদিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে একজন শুনবেন সরকারের কথা আর একজন শুনবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা।

এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোতে শৃঙ্খলা থাকার কথা নয়। ব্যাংকের শৃঙ্খলার জন্য একই ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়ে পরিচালনা করা দরকার। তাই সরকারের দায়িত্ব হলো সব বিষয় মনিটরিং করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করা। আর পরের কাজ হলো ঘন ঘন ঋণখেলাপিদের যেসব সুবিধা দিচ্ছে—এসব বন্ধ করা। তারপর হলো ঋণখেলাপিদের রাষ্ট্রীয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া। তাঁরা আবার রাষ্ট্রীয় অনেক ধরনের প্রণোদনা পান, সেই সব বন্ধ করে দিতে হবে। যিনি ঋণ নেবেন, তাঁর যদি অন্যান্য শিল্পকারখানা থাকে, তার সবগুলোর ছাড় বন্ধ করে দিতে হবে।

আজকের পত্রিকা: আইএমএফের শর্ত মেনে ঋণ নেওয়া কিছু ক্ষেত্রে দেশের নীতি-সার্বভৌমত্বের ‘আত্মসমর্পণ’ নয় কি?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: যথাসম্ভব বিশ্বের যেকোনো এজেন্সি, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। যদিও এসব সংস্থা থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া হয়। আবার সুদের হার কম, কিন্তু শর্ত অনেক বেশি। এই শর্তগুলো সব সময় সেই দেশের সুবিধার জন্য দেওয়া হয়, বিষয়টি সে রকমও নয়। কিন্তু সরকার বাধ্য হয়েই আইএমএফের ঋণ নিয়েছে। কারণ, প্রবাসী আয় কম আসছে এবং রপ্তানির পরিমাণ কমে গেছে। রাজস্ব ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না। কিন্তু আইএমএফ যেসব শর্ত দিচ্ছে, তা আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকের ওপর চাপ পড়ছে। তারা ভর্তুকি উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। আমরা কি সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি উঠিয়ে দিতে পারব? আবার কোনো প্রকল্প হাতে নিলে এভাবে করো, এভাবে করো—এ ধরনের নানা শর্ত চাপিয়ে দেয়। আমার কথা হলো, আমার প্রয়োজনে আমি ঋণ নেব। আবার যে প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া হলো, সেখানে কোনো ধরনের দুর্নীতি হলে ঋণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে ঋণ নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে ফলদায়ক হয় না। 

আজকের পত্রিকা: দেশের এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধার পেতে আপনার পরামর্শ কী? 
সালেহউদ্দিন আহমেদ: প্রথম কথা, সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই সঙ্গে সব জায়গায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়া মেনে সব প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করতে হবে। কেউ যদি অন্যায় ও দুর্নীতি করেন, তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে। আসলে এই সবের কোনো কিছুই করা হয় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ লোক দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহি থাকতে হবে প্রত্যেক কর্মীর মধ্যে। ভালো ভালো লোক অনেক ক্ষেত্রে ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারছেন না। যাঁরা গলাবাজি করতে পারেন, জনপ্রিয়তা আছে এবং যাঁদের যোগাযোগ আছে, তাঁরাই প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে আছেন। এভাবে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ঘটানো যায় না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে দাঁড় করাতে হবে। কারণ শুধু নীতি ভালো হলে কোনো কাজ হবে না। তাই মানুষের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।

আর মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। দেশের প্রয়োজন না হলেও বিভিন্ন প্রকল্প নিতে হয়। উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই। শেষ কথা হলো, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন দেখালে হবে না। বৈষম্য কমিয়ে সমতা আনতে হবে। আয়ের বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। নতুবা আমরা একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারব না। 

আজকের পত্রিকা: আপনাকে ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে