বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও শিখা (১৯২৭) পত্রিকার অন্যতম প্রধান সারথি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন (জন্ম ৩০ জুলাই, ১৮৯৭; মৃত্যু ৯ অক্টোবর, ১৯৮১)। বাঙালি মুসলমান সমাজকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে; যুক্তি, বুদ্ধি ও জ্ঞানের আলোয় তাঁদের আলোকিত এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের কতিপয় শিক্ষক ছিলেন এর উদ্যোক্তা।
কাজী মোতাহার হোসেন ছাড়াও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, আব্দুল কাদির, আনোয়ারুল কাদির, আবুল ফজল প্রমুখ। সংগঠনটির স্লোগান ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। এর মুখপত্র হিসেবে প্রকাশ করা হয় শিখা পত্রিকা, যার মোট পাঁচটি সংখ্যার দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি সম্পাদনা করেন কাজী মোতাহার হোসেন। শুধু তা-ই নয়, এই পত্রিকায় তাঁর পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধগুলো ছিল ‘সংগীত চর্চায় মুসলমান’ (১ম বর্ষ, ১৯২৭), ‘মানবমনের ক্রমবিকাশ (২য় বর্ষ, ১৯২৮), ‘ধর্ম ও সমাজ’ (৩য় বর্ষ, ১৯২৯), ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ (৪র্থ বর্ষ, ১৯৩০), ‘নাস্তিকের ধর্ম’ (৫ম বর্ষ, ১৯৩১)। এ ছাড়া তাঁর লিখিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের কার্যবিবরণী এবং তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনের বিবরণী শিখায় প্রকাশিত হয়।
কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন উদার, অসাম্প্রদায়িক এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তাঁর চিন্তাশীল মন মুসলমান সমাজের কূপমণ্ডূকতা, পশ্চাৎপদতা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূরীভূত করতে কাজ করেছে। শিক্ষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়ে তাদের চেতনাকে জাগ্রত করতে তিনি লেখনী ধারণ করেছেন। শিখায় প্রকাশিত লেখাগুলোতে তিনি মানবমন, ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত প্রভৃতি বিষয়ে যুক্তিগ্রাহ্য অভিমত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিটি জাতি ও ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠ ও অপরিবর্তনীয় বলে মনে করে। তবে শাস্ত্র ও বিশ্বাসকে অপরিবর্তনীয় ও ধ্রুব সত্য বলে মনে করলে ধর্মপ্রবৃত্তির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাই নতুন যুগের, নতুন জ্ঞানালোকের সঙ্গে ধর্মকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ‘ধর্ম ও সমাজ’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মানুষের কল্যাণের জন্যই ধর্ম, মানুষের জন্যই সমাজ।
ধর্ম ও সমাজ যদি মানুষের অবাধ মুক্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি ধর্মশিক্ষার পাশাপাশির বিজ্ঞান, সাহিত্য ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখার জ্ঞানার্জনের কথা তুলে ধরেছেন। ‘নাস্তিকের ধর্ম’ প্রবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও সংসারে এত পাপাচার কেন? এর মূলে তিনি যে গলদটি খুঁজে পেয়েছেন—তা হলো, অধিকাংশ মানুষ মুখে যা বিশ্বাস করে, হৃদয়ে তা ধারণ করে না। ‘মানবমনের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে কীভাবে মানুষের বিশ্বাসের ভূমিতে নানাভাব যুক্ত হয়েছে, তার ব্যাখ্যা করে বলেছেন, আমরা যেসব প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, জ্ঞানান্বেষী হিসেবে আমাদের তা অনুসন্ধান করা উচিত; আর যেসব বিষয় নৈতিক নিয়মের অধীন, নাগরিক হিসেবে সেগুলো পালন করা কর্তব্য।
শিখায় প্রকাশিত কাজী মোতাহার হোসেনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘সংগীতচর্চায় মুসলমান’। মুসলমান সমাজে সংগীত, সাহিত্য, নাটক, চিত্র, ভাস্কর্য প্রভৃতি সম্পর্কে যে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করা হয়, তা দূরীভূত করতে নানা যুক্তি ও দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। সংগীতকে তিনি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। একে কোনো অনুশাসন দ্বারা চাপিয়ে রাখার সুযোগ নেই। ধার্মিক মুসলমানরা সংগীতকে প্রীতির চোখে না দেখলেও উচ্চকণ্ঠে সুললিত সুরে আজান দেয়, সুমিষ্ট স্বরে কোরআন পাঠ করে এবং পরমার্থ সম্বন্ধীয় গজল-কাওয়ালি গায়। মিলাদ শরিফে তারা যে দরুদ পাঠ করে, তাতেও সংগীতের সুর ধ্বনিত হয়। এসব দৃষ্টান্ত তুলে ধরে কাজী মোতাহার হোসেন বলেছেন, ‘নানারূপ ধর্মীয় ও সামাজিক বিধি-নিষেধের ভেতরেও অনুষ্ঠানপ্রিয় মুসলমানের স্বাভাবিক সংগীতস্পৃহা চরিতার্থ করার সুযোগ রয়েছে।’
গত শতাব্দীর বিশ ও তিরিশের দশকে শিখা পত্রিকায় কাজী মোতাহার হোসেন আমাদের সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে যেসব বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন, একালেও তা প্রাসঙ্গিক। তিনিসহ মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্য সভ্যরা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের যে আলো প্রজ্বালিত করেছিলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তীকালে তা উজ্জ্বল না হয়ে ক্রমে ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে উঠলে আমাদের চারপাশের এত অবক্ষয় থাকত না। শিখার সারথিদের চেতনার আলোয় আমাদের সমাজ আলোকিত হোক; অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হোক। কাজী মোতাহার হোসেনের ১২৫তম জন্মদিনে এটাই প্রত্যাশা।