আমাদের দেশে সরকারি হাসপাতালে যথেষ্ট পরিমাণ চিকিৎসক না থাকা এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা, নৈরাজ্যের অভাবে সুচিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। আবারও এমন অভিযোগ পাওয়া গেল। রংপুর বিভাগের ৮ জেলার সরকারি হাসপাতালে অর্ধেক চিকিৎসকের পদই খালি। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা পাওয়া যে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘চিকিৎসক অর্ধেক: বিঘ্নিত সেবা’ শিরোনামে আজকের পত্রিকায় যে খবর বেরিয়েছে, তাতে এসব তথ্য পাওয়া যায়। ভয়াবহ বিষয় হলো, ওই ৮ জেলার অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নাক-কান-গলা, হৃদ্রোগ, ফিজিক্যাল মেডিসিন, চর্ম, যৌন ও চক্ষুবিশেষজ্ঞের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
শুধু চিকিৎসকের সংকট নয়, চিকিৎসা-সম্পর্কিত সরঞ্জামাদির ঘাটতির খবরও মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাওয়া যায়।
মূলত দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে যায়। কারণ, সেখানে কম খরচে সেবা পাওয়া যায়। আরেকটি কথা না বললেই নয়, আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৈষম্যের ব্যাপার আছে। সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা সামগ্রীর অপ্রতুলতা, চিকিৎসকের অভাব এবং যথার্থ চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে রোগীরা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়। অপরদিকে বেসরকারি হাসপাতালে সবকিছু ঠিকমতো পাওয়া যায় শুধু বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। সেখানে শুধু টাকাওয়ালাদের প্রবেশ অবারিত থাকলেও দরিদ্র মানুষের পক্ষে সেটা কঠিন।
বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসে সুযোগ না পেলে তো বেসরকারি মেডিকেলেই চাকরি করেন। বছর বছর অনেক শিক্ষার্থী চিকিৎসাশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের সংকট হয়, বিশেষ করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু একটি বিভাগের ৮ জেলার সরকারি হাসপাতালে কেন চিকিৎসক-সংকট থাকবে, সেই প্রশ্ন সচেতন যেকোনো নাগরিকের মনে জাগতেই পারে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট না হলেও যতটা আছে, তা-ও যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যেত, তাহলে হয়তো অবস্থা এত করুণ হতো না। আবার নিয়োগকৃত চিকিৎসকেরা যাঁর যাঁর পদে বহাল থেকে যদি সেবা দিতেন, তাহলে পদ খালি পড়ে থাকত না। কারণ অনেক চিকিৎসক রাজধানীকেন্দ্রিক সুবিধা পেতে ঢাকামুখী হওয়ার আবেদন করেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সফল হন। সেই সব সুবিধা যদি জেলা-উপজেলায় নিশ্চিত করা হয়, তাহলে হয়তো বর্তমান চিত্রের পরিবর্তন হতে পারে।
এমনিতেই বাংলাদেশে সুচিকিৎসা পাওয়া দুর্লভ বিষয় হয়ে উঠেছে। এতে রাষ্ট্রের সহযোগিতায় অন্তত টাকার অভাবে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না—এমন ধারণা করাই যৌক্তিক। মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির পথ আমাদের দেশে মসৃণ ও সহজলভ্য করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। নইলে অর্ধেকসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে জনগণ অর্ধেক সেবাই পাবে।