সবুজের বৃত্তে রক্ত লাল সূর্যের এক পতাকা। একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে এটি ছাড়া গর্ব আর অহংকার করার মতো উল্লেখযোগ্য কীই-বা ছিল! অর্থ-বিত্তহীন একটি মানচিত্রে রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট বলতে যা ছিল, সবই বিধ্বস্ত। একটি নতুন দেশের টানাটানির সংসারে, বিদেশি সহায়তা ও ঋণের টাকায় কিছু কিছু কাজ শুরু হলো। ওই ৫০ বছর আগে, ওই মাটির রাস্তা, ভাঙা সেতুর চিত্র দেখে কার ভাবনায় এসেছিল যে নদীমাতৃক এই দেশের আনাচকানাচে বাঁশের সাঁকোর জায়গায় স্থান করে নেবে হাজার হাজার পুল-কালভার্ট-সেতু? কখনো কি ভাবনায় ছিল যে মাটির রাস্তাগুলো ক্রমেই পাকা রাস্তায় রূপান্তর হবে?
দেশজুড়ে এখন শতসহস্র পাকা সেতু, হাজার কিলোমিটার সড়কের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। তখনো কেউ সাহস করে ভাবতে পারেনি যে পদ্মার মতো খরস্রোতা বিশাল নদীতে অনিন্দ্যসুন্দর এক সেতুর অবয়ব ফুটে উঠবে! একসময়ের স্বপ্ন এখন বাস্তব। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের যে কয়টি বিষয় সবচেয়ে গর্ব আর অহংকারের জায়গা দখল করেছে, সেটিই পদ্মা সেতু। এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আর জীবন-জীবিকার অনন্য প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মেলবন্ধন ঘটিয়েছে পদ্মা সেতু। কখনো যা ছিল বাংলাদেশের মানুষের কাছে রূপকথা, তাই এখন বাস্তব!
তবে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্যাপনের প্রাক্কালে পদ্মা সেতুর কাঠামোতে যখন কালো বিটুমিন লাগছে, তখন থেকে অন্তত এক যুগ আগেও পদ্মা সেতু দুলছিল অলীক স্বপ্ন, বিতর্ক আর অনিশ্চয়তার দোলাচলে। দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এডিবি, আইডিবির টাকায় সেতুটি তৈরি হবে—এই ছিল সিদ্ধান্ত। আকস্মিক প্রকল্পটিতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশসহ বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশ নিয়ে কুৎসা রটনা। পিছিয়ে যায় বিশ্বব্যাংক। মাসের পর মাস সমালোচনা, বিতর্কের চূড়ান্ত মঞ্চায়ন। কাঠগড়ায় বাংলাদেশ। অনিশ্চিত হয়ে পড়ল পদ্মা সেতুর ভাগ্য। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, আমলা ও উপদেষ্টাকে অভিযুক্ত করা হলো। কানাডার কোর্টে চলতে থাকল মামলা। একদিকে তদন্ত, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংককে না বলে দিয়ে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু তৈরির আয়োজন করতে থাকল বাংলাদেশ। একসময় মামলায় দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো। বাংলাদেশও আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। প্রমত্তা পদ্মার উত্তাল ঢেউ ফুঁড়ে একে একে মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকল পদ্মা সেতুর খুঁটি। গাড়ি নিয়ে এপার-ওপার করা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এখন পদ্মা সেতুকে যতটা না লোহা আর পাথরের অবয়ব ভাবা হচ্ছে, তারচেয়ে বেশি মনে করা হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে। একসময় যে দেশের এক বছরের রাজস্ব আয় ছিল মাত্র কয়েক শ কোটি টাকা, সেই দেশটি একটিমাত্র সেতু বানাতেই খরচ করতে পারছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ—এটাও বাস্তবতা। যে দেশে বিস্তর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, সেই দেশটি কীভাবে বিশ্বের অন্যতম একটি জটিল সেতু বানানোর কাজে হাত দিতে পারে—এটিও বিস্ময়কর।
জানা যায়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হচ্ছে ইতিহাসের একটি বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে রয়েছে চার লেনের সড়কপথ এবং নিচের স্তরটিতে রয়েছে একটি একক রেলপথ। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮ দশমিক ১০ মিটার প্রস্থ পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতু।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্মাণস্থল মুন্সিগঞ্জ জেলার মাওয়া, মাদারীপুর জেলার শিবচর ও শরীয়তপুর জেলার জাজিরায় উৎসবের আমেজে চলছে সেতুর কাজ। সরকারের পরিকল্পনামাফিক ২০২২ সালের জুনেই যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। সেতু ঘিরে দক্ষিণ জনপদের আর্থসামাজিক অবস্থা আমূল বদলে যাওয়ার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে দেশের জিডিপিতে বাড়তি ১ শতাংশ যোগ হবে শুধু এই সেতুর কারণে।
এ বিষয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একসময় বাংলাদেশকে কেউ মূল্যায়ন করেনি। অনেকে মনে করেছিল বাংলাদেশ এ সেতু বানাতে পারবে না। কারিগরি দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম জটিল এই সেতু বাংলাদেশের একমাত্র জটিল প্রকল্প। আর্থিকভাবে এ সেতু বাংলাদেশ বানাতে সক্ষম—এটা অনেকে ভাবেননি। আমাদের টাকায় করব, এটাও অনেকের ধারণায় ছিল না। এটা এখন বাস্তব। এতে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েছে। এটা আমাদের অহংকার ও গর্ব করার মতো একটি স্থাপনা। আমি মনে করি, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এ রকম বড় কাজ বাংলাদেশে কমই হয়েছে। এটি আর কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়।’