তাঁর বাঁ পা ইচ্ছে করলে স্তব্ধ করে দিতে পারত গোটা পৃথিবীকে। তাঁর বাঁ পা চাইলেই সৃষ্টি করতে পারত ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কিংবা ‘নিঃসঙ্গতার ১০০ বছর’-এর মতো অনবদ্য আরেকটি সাহিত্যকর্ম। মিকেলাঞ্জেলোর বিখ্যাত ‘দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম’ ছবির দিকে তাকালেও আপনার মনে পড়তে পারে ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথা। ফুটবলে সৃষ্টিশীলতার কথা বললেও আপনার মনে পড়বে তাঁর কথা। তিনি নিছক কোনো খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন শিল্পী। অনেকের কাছে ফুটবলশিল্পেরও শেষ নাম ম্যারাডোনা।
৩০ অক্টোবর, ১৯৬০ সালে বুয়েনস এইরেস থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ম্যারাডোনা নামক রূপকথাটি। গত বছরের এই দিনে সেটি বিরতি নিয়েছে বটে, তবে খুব দ্রুত থামবে বলে মনে হয় না। এমন রূপকথা এক বছর কেন, হাজার বছরেও যে থামার নয়!
ম্যারাডোনা আসলে কেমন, তা জানাতে গিয়ে তাঁর আত্মজীবনী ‘এল ডিয়েগো’র ভূমিকায় মার্সেলা মোরা যা লিখেছেন তা অনেকটা এ রকম—ঈশ্বর থেকে রাজনৈতিক কৌশলী, সন্ত থেকে মাদকসেবনকারী আর ভিলেন থেকে নির্যাতিত সবকিছুই যেন একবিন্দুতে মিলে যায়। ম্যারাডোনা এমনই। ভক্তরা যতই তাঁকে স্বর্গের দূত বানাতে চেয়েছেন, ম্যারাডোনা যেন ততই চেয়েছেন নিজেকে রক্তমাংসের একজন হিসেবে দেখাতে।
অথচ ম্যারাডোনার আগে নাপোলিকে ‘না’ করে দিয়েছিলেন ইতালির কিংবদন্তি তারকা পাওলো রসি। কারণ একটাই, নেপলসে মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ‘সত্যি কথা হচ্ছে, আমি আসার আগে কেউ নেপলসে আসতে চাইত না।’ নেপলসের সঙ্গে ম্যারাডোনার সম্পর্ক নিয়ে সত্য, অর্ধ-সত্য ও মিথ্যা অনেক গল্প আছে। কথিত আছে, একবার নাপোলির জয়ের পর রাস্তায় নেমে হই-হুল্লোড় করছিলেন ম্যারাডোনা ও তাঁর সতীর্থরা। এক বৃদ্ধা লাঠি হাতে রাগ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এরা কোন শয়তান!’ ম্যারাডোনার পাল্টা জবাব, ‘আমি ডিয়েগো, নেপলসের রাজা!’ বৃদ্ধা চিনতে পেরে আদর করে বলেন, ‘আরে সত্যিই তো, এ আমাদের রাজাই দেখছি।’
ম্যারাডোনা নামের রূপকথাটি চূড়ান্ত উৎকর্ষতা ছুঁয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। প্রায় একক নৈপুণ্যে মাঝারি মানের একটি দলকে তিনি বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। সেই বিশ্বকাপে তিনি একাই জন্ম দিয়েছিলেন ইতিহাস গড়া একাধিক মুহূর্তের। এমনকি ডোপ পাপে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে ম্যারাডোনা ছিটকে যাওয়ার পর বাংলাদেশেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন অনেক সমর্থক।
ম্যারাডোনার মৃত্যুর এক বছর পরও থামেনি তাঁকে নিয়ে চলতে থাকা এই সব গল্পগাথা। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক কি না, সে প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগও। মৃত্যুর পরও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না তাঁকে। তবে এসব বিতর্কের গা ঘেঁষে ফুটবলের মহান এক শিল্পী হয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন এই জাদুকর। যে জাদুকর মর্ত্যলোক ছেড়ে যাননি, সে রূপকথার কোনো মৃত্যু হয় না।