হোম > ছাপা সংস্করণ

সেই সত্য, রচিবে যা তুমি...

বিভুরঞ্জন সরকার

বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে কি না, সেটা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ মনে করেন দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, আবার কেউ মনে করেন আছে। তবে সরকারপক্ষ তাদের সমালোচনা পছন্দ করে না—এটা ঠিক। শুধু বর্তমান সরকারের আমলেই গণমাধ্যমের ওপর বা স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর অসহিষ্ণুতা দেখানো হচ্ছে, ব্যাপারটা তেমনও নয়। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বঙ্গবন্ধুর আমল ছাড়া আর সব আমলেই হয়েছে। তবে আমরা যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই সরকারকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারী বলে মনে করে থাকি। কারণ বর্তমানটা আমাদের কাছে যতটা জ্বলজ্বলে, অতীতটা ততটাই ধূসর।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায়ই বলেন, সরকার সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করছে। তিনি এটাও বলেন, ‘সত্য উদ্ঘাটন করাই তো সাংবাদিকদের কাজ।’ কোনো সন্দেহ নেই, সত্য উদ্ঘাটন করাই সাংবাদিকদের কাজ। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কি এটা মির্জা সাহেবদের মনে ছিল?

বিএনপির আমলে কি দেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন কম হয়েছে? বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যাও করা হয়েছে। হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা, শামছুর রহমান, দীপঙ্কর চক্রবর্তী খুন হয়েছিলেন কোন আমলে? কোনো হত্যাকাণ্ডের কি সঠিক তদন্ত ও বিচার হয়েছিল? আমাদের দেশে ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনীতিবিদেরা যা বলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তার বিপরীতটা করেন। রাজনীতির এই বৈপরীত্য সমাজের অন্য ক্ষেত্রগুলোকেও প্রভাবিত করে। গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতাও রাজনীতির ‘মন্দ’ হাওয়া থেকে মুক্ত নেই। মুক্ত থাকার বাস্তব কারণও নেই।

সমাজের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যেমন দুর্নীতি-অসততা আছে, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যেও আছে। তবে এর মধ্যে মাত্রাভেদ আছে। অন্য পেশার তুলনায় সাংবাদিকদের মধ্যে দুর্নীতি ও অসততা কম বলেই আমার ধারণা। কোনো সাংবাদিকের পুকুরচুরি, সাগরচুরির সুযোগ নেই। সাংবাদিকদের কেউ কেউ কিছু ‘ধান্দা’ করেন বলে অভিযোগ শোনা যায়। তবে ধান্দাবাজ সাংবাদিকের সংখ্যা কম বলেই আমার ব্যক্তিগত ধারণা। স্বল্প বেতন এবং অনিয়মিত বেতনের কারণে সাংবাদিকদের কেউ কেউ হয়তো কারও কাছে কিছু সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকতে পারেন। তাতে অন্যের কোনো ক্ষতির কারণ ঘটে বলে মনে হয় না।

ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৮৬ সালে আমি কমিউনিস্ট পার্টির সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘একতা’য় কাজ করতাম। মাসিক বেতন ৮০০ টাকা। সে সময় আমি বিয়ে করলাম। বিয়ে করার কারণে (যেহেতু স্ত্রী চাকরি করত না) বেতন বেড়ে হলো ১ হাজার ২০০ টাকা। একটি কমিউনিস্ট পরিবারের সঙ্গে সাবলেট থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। থাকা-খাওয়া বাবদ তাদের দিতে হতো ২ হাজার টাকা। অন্য খরচ-খরচা যদি বাদও দেওয়া হয়, তাহলেও আমার বেতনের চেয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যয় ৮০০ টাকা বেশি। নতুন বিয়ে। কীভাবে ব্যয় নির্বাহ করেছি? সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ আমি একটি লেখা দিতাম। প্রতি লেখার জন্য পেতাম পাঁচ শ টাকা। মাসে চারটি লেখা দুই হাজার টাকা। লেখার সম্মানী পরিশোধে সম্পাদক শফিক রেহমান ছিলেন খুবই উদার। মাস শেষ হতে না হতেই চেক! যায়যায়দিন বন্ধ হওয়ার পর আমি রাত জেগে বইয়ের প্রুফ দেখে আয় বাড়ানোর চেষ্টাও করেছি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও পার্টির নেতাদের দু-একজন বলেছেন, আমি গাছেরটাও খাচ্ছি, তলারটাও কুড়াচ্ছি। পরিশ্রম করেই আয় করে ব্যয় নির্বাহের চেষ্টাও কারও কারও কাছে গাছেরটা খেয়ে তলারটা কুড়ানো মনে হলে কী আর করা!

আমাদের দেশে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষও সাংবাদিকদের একধরনের ‘ধান্দা’র জীবন বেছে নিতে বাধ্য করেন বলে আমার মনে হয়। ঢাকার সাংবাদিকদের থেকে মফস্বলের সাংবাদিকদের জীবন আরও দুর্বিষহ। বেশির ভাগ মফস্বল সাংবাদিক একটি নিয়োগপত্র এবং পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছুই পান না। কোনো কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল কিছু মাসোহারা দিলেও তা অতিসামান্য এবং অনিয়মিত। তাহলে মফস্বল সাংবাদিকের সংসারজীবন চলে কীভাবে? নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যায়, কিন্তু নিজের খাওয়াটা তো থাকতে হবে!

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে যাঁরা সাংবাদিকদের কাছে সততা আশা করেন, তাঁরা আসলে কল্পজগতের বাসিন্দা। কিছু ‘তারকা’ সাংবাদিকের আয়-উপার্জন বা জীবনযাপন দেখে যাঁরা মনে করেন সাংবাদিকদের আর সমস্যা কী—তাঁরা বাস্তবটা জানেন না, জানার চেষ্টাও করেন না।

সাংবাদিকদের সত্য সন্ধানের তাগিদ অহরহ দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, কোন সত্য সন্ধান করবেন একজন সাংবাদিক? ব্যক্তি সাংবাদিকের কি আলাদা কোনো অস্তিত্ব আছে? আমি যদি অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন তৈরি করি, সেটা প্রচার বা প্রকাশের ক্ষমতা তো আমার নেই। সেটা তো মালিক বা সম্পাদকের হাতে। মালিক বা সম্পাদকের ব্যবসায়িক কিংবা অন্য স্বার্থের সঙ্গে আমার প্রতিবেদন সাংঘর্ষিক হলে সেটা প্রকাশ হবে, তার নিশ্চয়তা আছে কি?

একসময় ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনি প্রকাশ করে পাঠকপ্রিয় হয়েছিল সাপ্তাহিক ‘একতা’। এখন কি কোনো গণমাধ্যম ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবে? আমাদের দেশে ধনিকগোষ্ঠী তো গড়েই উঠেছে লুটপাটের মাধ্যমে। লুটেরা পুঁজির মালিকেরাই তো এখন দেশের রাজনীতি ও গণমাধ্যমের নিয়ন্তা। কিছু ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে আনা যায়, কিন্তু তা যুক্তিকে জোরদার করে না। গণমাধ্যমের মালিকানা এবং পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন না হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একটি অলীক কল্পনা হয়েই থাকবে। আর সাংবাদিকদের বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা নিশ্চিত না করে তাঁদের কাছে সৎ সাংবাদিকতা আশা করাও দুরাশা। কারণ, এখন ‘সেই সত্য রচিবে যা তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো’।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই—এই কথা বলা হচ্ছে এবং গণমাধ্যমে তা প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে। কী এমন কথা, কার মনে আছে, যা তিনি বলতে পারছেন না? হ্যাঁ, কিছু মামলা-গ্রেপ্তারের মতো নিন্দনীয় ঘটনা ঘটছে, কারও কারও মধ্যে কিছু অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে। ‘রাজা যত বলে পারিষদ দলে, বলে তার শত গুণ’—এটা তো নতুন কিছু নয়। ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার ঘটনা ঘটে কি না, কে জানে? তবে নির্যাতন-নিবর্তনের একটি ঘটনাও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

মতপ্রকাশের জন্য জেল-জুলুমের শিকার হতে হলে, সেটা মানা যায় না। পেছন দিয়ে হাতি চলে যাবে, আর সামনে সুই দেখলে হৃৎকম্প হওয়াটা ভালো লক্ষণ নয়। সরকারে থাকলে সমালোচনা সহ্য করার মানসিক শক্তিও থাকতে হবে। হঠাৎ হঠাৎ মাথা গরম করা ঠিক না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা 

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে