হোম > ছাপা সংস্করণ

বায়ুদূষণ ও নগরস্বাস্থ্য

ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য থেকে দেখা যায় যে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ এমন বায়ুতে শ্বাস নেয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং এতে উচ্চমাত্রার দূষণ উপাদান থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুমণ্ডলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে পরিবর্তন করে কোনো রাসায়নিক, শারীরিক বা জৈবিক উপাদান দ্বারা অভ্যন্তরীণ বা বাইরের পরিবেশের দূষণকে বায়ুদূষণ বলে। গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত দহনযন্ত্র, মোটরযান, শিল্পকারখানা এবং বনের আগুন বায়ুদূষণের সাধারণ উৎস। জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের প্রধান দূষণকারীগুলোর মধ্যে রয়েছে পদার্থ কণা, কার্বন মনোক্সাইড, ওজোন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এবং সালফার ডাই-অক্সাইড। বাইরের ও অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ শ্বাসযন্ত্র এবং অন্যান্য রোগের কারণ, অসুস্থতা ও মৃত্যুর গুরুত্বপূর্ণ উৎস। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর সর্বোচ্চ প্রকাশ দেখা যায়।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বায়ুদূষণের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে। ঢাকার তুলনায় অন্যান্য নগর এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা কম। বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় বায়ুদূষণ এখনো তেমন কোনো সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। কেননা, এসব এলাকায় যন্ত্রচালিত গাড়ির সংখ্যা যেমন কম, তেমনি শিল্পকারখানার সংখ্যাও অল্প। তবে ইটের ভাটা এবং রান্নার চুলা থেকে গ্রাম এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণে বায়ুদূষণ ঘটছে।

শহরাঞ্চলে প্রধানত দুটি উৎস থেকে বায়ুদূষণ ঘটছে—শিল্পকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া। এ ছাড়া ইটের ভাটা, সার কারখানা, রাস্তা নির্মাণও বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে। এসব উৎস থেকে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া, বাষ্প, গ্যাস ও ধূলিকণা উৎপন্ন হয়, যা বাতাসের সঙ্গে মিশে বায়ুদূষণের সৃষ্টি করে। চামড়া কারখানাগুলো প্রতিনিয়ত হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, ক্লোরিনসহ আরও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করছে। দ্রুত নগরায়ণের কারণে নগরে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে বায়ুদূষণ বাড়ছে। দুর্বল ইঞ্জিনবিশিষ্ট পুরোনো বাস ও ট্রাক কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস নির্গত করে নগরীর রাস্তায় চলাচল করছে। প্রকৃতপক্ষে ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন চলাচলকারী অনেক যানবাহন ত্রুটিযুক্ত, যেগুলো প্রতিদিন সহনীয় মাত্রার অধিক ধোঁয়া নির্গত করে চলেছে। ডিজেলচালিত যানবাহনগুলো কালো ধোঁয়া নির্গত করে, যাতে দহন সম্পূর্ণ না হওয়া সূক্ষ্ম কার্বন কণা বিদ্যমান থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রধান ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো: সূক্ষ্ম পদার্থ কণা (পিএম ২.৫), ভারী পদার্থ কণা (পিএম ১০), ভূগর্ভস্থ ওজোন (O3), নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (NO2), সালফার ডাই-অক্সাইড (SO2) ও কার্বন মনোক্সাইড (CO2)। এর মধ্যে পিএম ২.৫ মানব স্বাস্থ্যের জন্য সব থেকে বেশি ক্ষতিকর। এগুলো অতি ক্ষুদ্রাকায় হওয়ার কারণে নাক দিয়ে প্রবেশ করতে পারে এবং ফুসফুসের মাধ্যমে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে, যা প্রধান অঙ্গগুলোকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। পিএম ২.৫-এর সংস্পর্শে আসার কারণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্‌রোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগ যেমন হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে আরও খারাপ অবস্থায় নিয়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুসারে শুষ্ক মৌসুমে শহরাঞ্চলে পিএম ২.৫ ঘনত্বের মাত্রা রেকর্ড করা হয়। যার কারণ বড় বড় নির্মাণকাজ আর বিরামহীন যানজট। দেখা গেছে, এই মাত্রা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত বাতাসের মান নির্দেশিকার থেকে প্রায় ১৫০ শতাংশ ওপরে, যাকে তুলনা করা যায় প্রতিদিন ১.৭টি সিগারেট খাওয়ার সঙ্গে। দ্বিতীয় উচ্চ ঘনত্বে পিএম ২.৫ মাত্রা পাওয়া গেছে ইটভাটার কাছে, যা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা থেকে ১৩৬ শতাংশ বেশি বা প্রতিদিন ১.৬টি সিগারেট খাওয়ার সমতুল্য। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাতাসের মান নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা ২০২১-এর হিসাবে পিএম ২.৫ মাত্রা মাত্র ১ শতাংশ বৃদ্ধিতে একজন ব্যক্তির শ্বাসকষ্টের আশঙ্কা ১২.৮ শতাংশ, কাশির আশঙ্কা ১২.৫ শতাংশ এবং শ্বাসনালির সংক্রমণের আশঙ্কা ৮.১ শতাংশ বেড়ে যায়। বায়ুদূষণের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব ব্যক্তিরা, শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চারা আর অন্যান্য রোগের কারণে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা। চিকিৎসক রাশিদা বেগমের বরাত দিয়ে একটি গণমাধ্যম জানায়, বিশেষ করে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি, শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বায়ুদূষণ বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণের এক ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর। এতে পুরুষের শুক্রাণু তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটছে, শুক্রাণুর মান কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে মেয়েদের ডিম্বাণু কল্পনাতীতভাবে কমে যাচ্ছে। আবার যেসব ডিম্বাণু রয়েছে, সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

বায়ুদূষণ কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালের বায়ুদূষণ হ্রাস কৌশল, ধোঁয়া নির্গমনের মাত্রা হ্রাস কৌশল এবং বায়ুর গুণগত মান উন্নত করতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করা। এ ছাড়া ২০২১ সালে সরকার মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা দশক ২০৩০ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত বায়ুর গুণাগুণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণ করলে হবে না, রাস্তায় অতিরিক্ত যানবাহন কমাতে হবে। ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি ও বাইকের সংখ্যা কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে রাস্তা থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি অপসারণ করতে হবে। যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী রাখা বন্ধ করতে হবে। ঢাকার রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায় একই রাস্তা বিভিন্ন সংস্থার কাজের প্রয়োজনে বারবার খোঁড়া হয়। এ ক্ষেত্রে সমন্বয় করে একবারে সব কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে হবে, বাড়াতে হবে বনায়ন। সরকার ও জনগণের মিলিত প্রচেষ্টায় কমবে বায়ুদূষণ, সুরক্ষিত হবে নগর স্বাস্থ্য।

লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট
কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে