বান্দরবানে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা এখনো চলছে। এই গাছ বহনে হাতির ব্যবহারের সংখ্যা কমলেও বন্ধ হয়নি পাচার। টংকাবতী রেঞ্জ এলাকায় গিয়ে এই অবস্থা দেখা গেছে। খোদ গাছ ব্যবসায়ী হাতি দিয়ে গাছ বহনের কথা স্বীকার করলেও তদন্তে গিয়ে হাতির দেখা পাননি দাবি বন বিভাগের লোকজনের।
গত ৮ অক্টোবর বান্দরবানের টংকাবতী রেঞ্জ এলাকায় ‘গাছা পাচারে বাহক হাতি’ শীর্ষক প্রতিবেদন আজকের পত্রিকায় প্রকাশ হয়। এতে টনক নড়ে বন বিভাগের। এর পরদিন ৯ অক্টোবর টংকাবতী রেঞ্জ এলাকায় তদন্তে যান বন বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে তদন্তে গিয়ে তাঁরা ‘তেমন কিছু পায়নি’ বলে জানা গেছে। বরং সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা এ প্রতিবেদকের কাছেই ‘কোথায় হাতির ব্যবহার হয়’ জানতে চান।
৩০৯ নম্বর দক্ষিণ হাঙ্গর হেডম্যান পাইরিং ম্রো গত সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বন বিভাগের লোকজন দিনে তদন্তে গেছেন। তারা জানিয়ে গেলে কী আর অনুমতি ছাড়া গাছ কেটে নেওয়া পাচারকারীরা সেখানে থাকবে?’
বাগান থেকে গাছ কাটার জন্য সরকারকে ফি দিতে হয় না, কেবল অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু অধিক লাভের জন্য বিভিন্ন বাগান থেকে অনুমতি ছাড়াই গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ আছে, বন বিভাগকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বন খেকোরা বাগানের ছোটবড় গাছ নির্বিচারে কেটে নিচ্ছেন।
হেডম্যান পাইরিং জানান, তার মৌজায় কাঠ বহনে মাঝে মাঝে কয়েকটি হাতি দেখা যায়। এ সব হাতি দিয়ে আবদুর রহিম কোম্পানী, মহরম আলী কোম্পানী, আবদুস শুক্কুর ও আবদুল আলম নামে প্রভাবশালীরা গাছ নিয়ে যান বলে তিনি জেনেছেন।
পাইরিং ম্রো বলেন, ‘আগে বন থেকে গাছ কেটে ৪টি হাতি দিয়ে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর আবদুর রহিম কোম্পানী তাঁর দুটি হাতি সেখান থেকে নিয়ে যান। তবে আরেক গাছ পাচারকারী মহরম আলী কোম্পানীর দুটি হাতি এখনো ওই এলাকায় আছে।’
এদিকে বান্দরবানের টংকাবতী বন রেঞ্জ ও আশপাশ এলাকার কয়েকটি মৌজা থেকে প্রতিদিন পাচার হচ্ছে বিভিন্ন বাগানের গাছ। পার্শ্ববর্তী উপজেলা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে লোকজন এসে পাহাড়ের বাইরের আবরণ ঠিক রেখে ভেতরে বনের কাঠ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলার টংকাবতী ইউনিয়নের ৩০৯ নম্বর দক্ষিণ হাঙ্গর, ৩১১ হরিণঝিরি, ৩১২ নম্বর পাইনছড়ি মৌজার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাকৃতিক বন কেটে নিয়ে যাচ্ছে আবদুর রহিম কোম্পানী, মহরম আলী কোম্পানী, আবদুল আলম, আবদুস শুক্কুরসহ কয়েকজন। তাঁদের অঘোষিত ‘সিন্ডিকেট’ বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন বাগানের গাছ কেটে নিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রুইঅং কার্বারি সাংবাদিকদের জানান, টংকাবতী ও হরিণঝিরি দুটি মৌজায় এক সময় প্রাকৃতিক বনে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে স্থানীয় কতিপয় মানুষের সহায়তায় পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আবদুর রহিম কোম্পানীর লোকজন প্রাকৃতিক বনের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, কারবারিরা বনের ভেতর কাঠুরিয়া দিয়ে গাছ কেটে ৩-৪টি হাতি দিয়ে তা বনের বাইরে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে সেখান থেকে করাত দিয়ে কেটে টুকরা (রদ্দা) করে ট্রাকে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেন। এ ছাড়া বড় গাছের পাশাপাশি ইট ভাটার জন্য ছোটগাছও কেটে নেওয়া হচ্ছে।
হেডম্যান পাইরিং ম্রো বলেন, ওই এলাকা থেকে হাজার হাজার সেগুনসহ বিভিন্ন গাছ কেটে নেওয়া হলেও তাঁকে এর কিছুই জানানো হয় না। অথচ ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগান থেকে গাছ কাটতে হলেও বন বিভাগের অনুমোদন লাগে। এ ক্ষেত্রে মৌজা প্রধান হিসেবে হেডম্যানের প্রতিবেদন প্রয়োজন হয়।
জানা যায়, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলে কাঠ চোরা কারবারিরা সক্রিয় হয়ে উঠে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শেষে বনের ভেতর থেকে কাঠ পরিবহনের সুবিধার্থে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়। ডিসেম্বর থেকে পুরো শুষ্ক মৌসুমে ট্রাকে ভরে কাঠগুলো রঙিমুখ-নাফারটিলা-চরম্বা সড়ক হয়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সম্প্রতি বান্দরবান থেকে কয়েকজন সাংবাদিক সরেজমিনে গিয়ে দেখেন, টংকাবতী এলাকায় রাস্তার পাশে একটি ঘরে অবস্থান নিচ্ছেন কিছু শ্রমিক। এ সময় তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা লোহাগাড়ার আবদুর রহিম কোম্পানীর গাছগুলো কেটে ট্রাকে তুলে দেন। আরেকটি গ্রুপ বনের ভেতর থেকে গাছগুলো পাঠান। কাঠের বৈধতার বিষয়ে তাঁদের কিছু জানা নেই বলেও স্বীকার করেন।
গত মঙ্গলবার এ ব্যাপারে মহরম আলী কোম্পানী আজকের পত্রিকার কাছে গাছ কাটার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সিলেটের এক মালিকের হয়ে তিনি এখানে কাজ করেন। দুর্গম এলাকা থেকে গাছ নেওয়ার সুবিধার্থে হাতি ব্যবহার করা হয়। এ কাজে তাঁদের দুটি হাতি ব্যবহার হয় বলেও তিনি স্বীকার করেন।
মহরম আলী বলেন, বন বিভাগ থেকে অনুমোদন নিতে নানা ঝামেলা, সময় ব্যয় হয় দেখে তারা এভাবেই বাগান থেকে গাছ কেটে নেন। তবে বন বিভাগকে ‘খুশি’ করেই তারা গাছ কেটে নেন।
বান্দরবানের সুয়ালক ও টংকাবতী রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মাঈনুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী গত মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি মাত্র এই রেঞ্জে যোগদান করেছি, সমতল আর পাহাড়ের বনায়নের আইন কানুন এক নয়। টংকাবতী এলাকায় সরকারি কোনো বনায়ন নেই।’
মাঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন বন থেকেই গাছ কেটে নেওয়া হয় বলে তাঁরা শুনেছেন। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর গত ৯ অক্টোবর ওই এলাকায় সরেজমিন তদন্তে যান। ওই সময় তাঁরা হাতি দেখেননি। তবে ওই এলাকা থেকে কাঠ পাচার হয় বলে শুনেছেন।