কাজের খোঁজে শ্রমের হাটে নারী শ্রমিকের উপস্থিতি নিত্যদিনের। সড়কে কিংবা খেতে-খামারে কাজ নেওয়ার জন্য মহাজনের দ্বারস্থ হতে হয় তাঁদের। ধান কাটার কাঁচি, মাটি কাটার কোদাল, খন্তা—সবই তাঁদের সঙ্গে থাকে। থলেতে থাকে প্রয়োজনীয় কিছু কাপড়।
এ গল্প কৃষিপ্রধান এলাকা নোয়াখালীর উপকূলীয় সুবর্ণচরের হারিছ চৌধুরীর বাজার ওরফে আটকপালিয়া বাজারের। বোরো ধান কাটা মৌসুমে হাটের দিন সর্দারের কাছে শ্রম বিক্রি করেন তাঁরা। উপজেলার দূর-দুরান্ত থেকে আসেন শ্রম বিক্রি করতে। বড়দের সঙ্গে আসে ছোটরাও। সংসারের হাল ধরতে কিংবা দীর্ঘ সময় স্বামীর অসুস্থতাজনিত বা অন্য কোনো কারণে আয় রোজগার করতে হয় তাঁদের।
মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে আসে কাজের সন্ধানে। যে বয়সে নারীদের দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সে বয়সে জীবিকার টানে কাজে আসেন তাঁরা।
দাসের হাট এলাকার শাহরাজের ৪ বছরের ছেলে মিল্টনকে রেখে কাজের থানার মোড়ে রাস্তার কাজে এসেছেন মা লক্ষ্মী রানি। বাড়িতে মাকে না দেখে কাঁদছে আর মা কোথায় গেছে জানতে চাচ্ছে। দীর্ঘ সময় সন্তানকে না দেখে থাকতে পারবেন তো? জানতে চাইলে লক্ষ্মীরাণী হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। এটা তাঁদের গা সওয়া হয়ে গেছে। লক্ষ্মী রানি বলেন, সংসার চালাতে টাকার প্রয়োজন। অভাবের সংসার, কাজে না এসে উপায় কী।
দীর্ঘ দুই বছর করোনাকালীন দোকান বন্ধ আর দারিদ্র্যের কারণে শহর ছেড়ে গ্রামে। ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে স্থায়ীভাবে দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে এসেছেন। বাধ্য হয়ে জীবিকার তাগিদে হাতে তুলে নেন লাঙল-কোদাল আর কাঁচি। দিনভর কঠোর পরিশ্রমের পর মেলে সামান্য মজুরি।
সুবর্ণচর উপজেলার থানার মোড় এলাকায় রত্না রানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারীদের মজুরি কম, খাটুনি বেশি। ধান কাটা ও রবিশস্য খামারের কাজে নারীদের দৈনিক মজুরি ২৩০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। কখনো আবার আরও কমও জোটে। খাটুনি ১০-১২ ঘণ্টা। সারা দিনে এক-দেড় ঘণ্টার বিশ্রাম পান।
সংসারের অসচ্ছলতা তাঁকে এগোতে দেয়নি। টাকার অভাবে অনেক ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটেনি। স্বামী অসুস্থ, তাই কাজে আসতে হয়েছে বলে জানান রত্না রানি।
চর আমান উল্যাহ বৈরাগী বাজার এলাকার অঞ্জনা, পিন্টু রানি, ঘোষ ফিল্ড এলাকার কল্পনা মজুমদার, অর্চনা রানি আরও অনেক নারী শ্রমিকের দেখা মেলে থানার মোড়ে।
একাধিক নারী শ্রমিক জানান, কাজে গাফিলতি করলে মজুরি কমে যায়। কিংবা কাজ কম পারলে কেউ সঙ্গে নিতে চায় না।
স্থানীয় লোকদের ভাষ্যমতে, ধান কাটা মৌসুম, তরমুজ আর সবজি চাষে পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে নারীরাও কাজে আসে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা আয়-রোজগার করে। সুবর্ণচরের চরবাটা, পূর্বচরবাটা, চরক্লার্ক, মোহাম্মদপুর, চরজব্বারে ওই নারী শ্রমিকদের দেখা মেলে।
নোয়াখালী নারী অধিকার জোটের সভাপতি লায়লা পারভীন বলেন, ‘নারীদের শ্রমের ক্ষেত্রে মূল্য বৈষম্য আছে। নারী তার শ্রমের সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। আমাদের নারী কৃষাণীদের কাজ সামনে আসছে না। আমরা বলতে পারি, প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের যে অবদান, নারীদের যে পরিশ্রম, সে জায়গা থেকে আমরা নারীদের দেখছি না।’
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা ও প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইয়ুম মাসুদ বলেন, প্রান্তিক নারীরা সমাজে ন্যায্য মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। পুরুষের সমপরিমাণ কাজ করেও তাঁরা সমান সুবিধা পাচ্ছেন না, মজুরি পান না। এক কথায় বলতে পারি, নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত।’
সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৈতী সর্ববিদ্যা আজকের পত্রিকাকে বলেন, উপজেলার যেসব উন্নয়ন প্রকল্পে নারীরা কাজ করেন, এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে মজুরিতে বৈষম্য করা হয় না।