হোম > ছাপা সংস্করণ

জীবন এখনো সুন্দর, এখনো পবিত্র মানুষের মন

অজয় দাশগুপ্ত

দেশের মিডিয়ায় নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি। বাঙালি কেন জানি আনন্দের চেয়ে বিষাদ আর শান্তির পরিবর্তে কলহে মগ্ন থাকতে পছন্দ করে। আমি আমার এই ৬৪ বছর বয়সে হিসাব করে দেখি, আমরা কেন জানি সব সময় নেতিবাচক কিছুতে বেশি আগ্রহী ছিলাম। এর কারণ হয়তো বারবার পরাধীন থাকা, হয়তো সুশাসনের অভাব, হয়তোবা আমাদের রক্তেই ঢুকে গেছে নৈরাজ্য আর প্রতিবাদের নামে নেতিবাচকতা। অথচ উন্নত নামে পরিচিত দেশগুলোর মিডিয়া এ বিষয়ে সতর্ক। তারা যেকোনো নেতিবাচক খবরকেও ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারঙ্গম। সম্প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলে অভাবনীয় সফলতার পর অস্ট্রেলিয়া হার মেনেছিল মেসির নৈপুণ্যের কাছে। সে খবরটি চমৎকারভাবে পরদিন সকালে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়ে এখানকার মিডিয়া শ্যাম ও কুল দুটোই রক্ষা করেছিল। একদিকে যেমন আত্মসম্মান, অন্যদিকে বহুজাতিক সমাজে যেন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ওপর কেউ চড়াও না হয়—এ দুই দিক বাঁচিয়ে করা হয়েছিল সংবাদের শিরোনাম। অথচ আমাদের দেশে প্রচুর ভালো খবর থাকলেও তা চোখের অগোচরে থেকে যায়।

যেমন ধরুন, সেঁজুতি সাহার খবরটি। সেঁজুতি শব্দের অর্থ বা তাঁর নামের অর্থ দিয়ে চমৎকার একটা ‘টুইস্ট নিউজ’ হতে পারত না? সন্ধ্যাপ্রদীপ যার নাম, সে যে দেশময় বিজ্ঞানচর্চার অন্ধকারে একটি প্রদীপের মতো, সে কথা লেখেনি কেউ। লিখলে কোমলমতি তারুণ্যের মনে হতো তারাও একদিন দীপ হয়ে জ্বলে উঠতে পারবে। যেমন ধরুন, ভিপি নুর ও তাঁর বিদেশে কী সব আবোলতাবোল ঘটনা নিয়ে কেমন মাতামাতি চলছে। ইউটিউবে দেখলাম তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর গলায় মালা দিয়ে বক্তব্য প্রচারের মহাসমারোহ। কিন্তু কেন? নুর তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী যা পাওয়ার তা পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের কাজ যেন নেতিবাচকতাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা। এর কারণ কি অচলায়তন ভাঙার স্পৃহা? নাকি একঘেয়ে দিনকাল ভেঙে নতুন কিছুর সন্ধান?

মোদ্দাকথায়, দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাংলাদেশিদের জীবনও হয়ে উঠছে কলহনির্ভর। আমি এখন যেকোনো আড্ডা বা মজলিশে যেতে রীতিমতো ভয় পাই। পরিচিতজন ব্যতীত অন্য কোথাও যেতে মন চায় না। এমনকি পরিচিতদের ভিড়েও নিজেকে অজানা-অচেনা মনে হয়। দেশে রাজনীতি নেই বলে যাঁরা দুঃখ করেন, তাঁদের একবার বিদেশে এসে সরেজমিনে দেখে যাওয়া উচিত, কাকে বলে দেশের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ যেহেতু অনেক বছর ধরে দেশ শাসনে, ফলে দলের শাখা-প্রশাখার কমতি নেই। নিন্দুকেরা বলে, একটা আওয়ামী লীগের সঙ্গে নাকি আরেকটা ফ্রি দেওয়া হয়! অন্যদিকে তলে তলে যত স্বাধীনতাবিরোধী আর দালালেরা ঐক্যবদ্ধ। তাদের শাখা আছে কি নেই বড় কথা নয়, বড় বিষয় তারা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। যে কথা বলছিলাম, যেকোনো ঘরোয়া আড্ডা মানেই শেখ হাসিনার বিরোধিতা, লীগের নিন্দা। কারও মুখে আপনি পদ্মা সেতু বা টানেলের গল্প শুনবেন না। শুনবেন না যোগাযোগ কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের গল্প। অথচ হিপোক্রেসিটা এই, এদের সামাজিক মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট জুড়ে দেশে গিয়ে পদ্মা সেতুতে বেড়ানো আর ইলিশ ভোজনের ছবিতে ভরা। এই দ্বৈততার কারণও বোঝা মুশকিল। তবে একটা ব্যাপার বুঝতে অসুবিধা হয় না, মানুষ কোথাও হয়তো ব্যতিক্রম চায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত আর কারও প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না তারা।

বলছিলাম ইতিবাচক খবরের কথা। এ লেখা যখন লিখছি, তখন ওমানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুব হকি দল। এত বড় একটা খবর পরিবেশন করতে গিয়ে দেশের একটি দৈনিক লিখেছে: ‘বাংলাদেশের হকিতে আজ দারুণ এক সাফল্য এসেছে। হোক তা যুবপর্যায়ে, তারপরও এশীয় পর্যায়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়া বড় কৃতিত্বই। সেটিও ওমানের মাঠে, ওমানকে হারিয়ে। আজ ওমানের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর এক ফাইনাল জিতেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২১ হকি দল। এশিয়ান হকি ফেডারেশন (এএইচএফ) কাপ অনূর্ধ্ব-২১ টুর্নামেন্টের রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে বাংলাদেশের কাছে ওমান টাইব্রেকারে হেরেছে ৭-৬ গোলে।’

প্রশ্ন হচ্ছে, ‘হোক তা যুব পর্যায়ে’ মানে কী? যুব পর্যায় কি ফেলনা কিছু? আজ যদি না পারত বা হারত আপনারাই লিখতেন, ‘তীরে এসে তরি ডোবানো আমাদের স্বভাব’! নেতিবাচকতায় আগ্রহী সংবাদমাধ্যমের রোগ এখন অনিরাময়যোগ্য। ভাইরে, এই যুব পর্যায়ে এশিয়া চ্যাম্পিয়নরাই বড় দলে খেলবে। উপযুক্ত সবকিছু পেলে এরাই এশিয়া কাপ হকিতে হয়তো বিজয় ছিনিয়ে আনবে। সে কথা লেখায় অনাগ্রহের কারণ কী, তা তো বুঝলাম না।

যখন চারদিকে কেবল দুর্ঘটনা, মারামারি আর মৃত্যুর খবর, তখন একটি অনুপম জন্মসংবাদ বড়ই প্রশান্তির। জন্ম সব সময়ই আনন্দের। একটি শিশুর জন্ম মানেই একটি সম্ভাবনার জন্ম। যে শিশুটি শিরোনাম হয়ে জন্মাল, সে একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে। রাজধানীর উত্তরা থেকে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে যেতে ১২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে স্বামী সুকান্ত সাহার সঙ্গে মেট্রোরেলে চড়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনিয়া রানী রায়। কিন্তু কে জানত, পথেই শুরু হবে তাঁর প্রসববেদনা! আগারগাঁও মেট্রোস্টেশনে নেমেই আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন সোনিয়া। পরে তাঁকে স্টেশনে ফার্স্টএইড সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে ধাত্রীর প্রশিক্ষণ থাকা সোনিয়া নামেরই এক রোভার স্কাউট সদস্য ওই অন্তঃসত্ত্বা নারীর সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।

পরে রোভার সোনিয়ার সাহায্য নিয়ে এক ছেলেসন্তানের জন্ম দেন সোনিয়া রানী রায়। এদিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে শিশুটির জন্ম হয়। এ সময় সোনিয়ার স্বামী সুকান্ত সাহাও উপস্থিত ছিলেন। শিশুটির জন্মের পর মাসহ তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয় ধানমন্ডির রেনেসাঁ হাসপাতালে। সোনিয়ার ওই হাসপাতালেই ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। এদিকে মেট্রোস্টেশনে এমনভাবে একটি শিশুর জন্মের ঘটনায় উচ্ছ্বসিত কর্তৃপক্ষ ও যাত্রীরা। উপস্থিত লোকজন শিশুটির নাম ‘মেট্রো’ রাখার প্রস্তাব করেন। তবে সুকান্ত সাহা জানিয়েছেন, তাঁদের বাচ্চার নাম আগেই ঠিক করে রাখা আছে।

এ খবরটি আমার কাছে নতুন বছরের চমৎকার সূচনার একটি শিরোনাম মনে হয়েছে। এই ঘটনা একদিকে যেমন মানবিকতা আর যত্নের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে আছে আশা ও ভালোবাসা। কতশত তুচ্ছ কারণে আমরা ভেদাভেদ আর অশান্তি ডেকে আনি। ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পরিচয় তার প্রধান একটি কারণ। নেতিবাচক প্রচারণার কারণে মাঝে মাঝে মনে হয় ভিন্নধর্মাবলম্বীদের প্রতি বুঝি আর কোনো দায়, মমতা বা ভালোবাসাই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই ঘটনা তা মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। আশা জাগিয়েছে, মানুষ মানুষের জন্য। এখনো নবজাতকের আগমনে প্রশান্তি আর ভালোবাসায় ঐক্যবদ্ধ আমাদের সমাজ।

এই সেদিন আমার মতো ক্ষুদ্র একজন মানুষের সম্মানে সমবেত হয়েছিলেন সিডনির সুধীজন। সে সভায় জন্মপরিচয়ে আমার স্বধর্মের মানুষ ছিলাম মাত্র তিনজন। আমি, আমার স্ত্রী ও পুত্র। বাদবাকি আয়োজক ও আগতদের সবাই ছিলেন সংখ্যাগুরু নামে পরিচিত সম্প্রদায়ের মানুষজন। তাই আমি কোনো দিন আস্থা হারাইনি, হারাবও না। আমাদের দেশ জাতি ও বিদেশের বাংলাদেশিদের একটাই পরিচয়, আমরা পদ্মাতীরের মানুষ। বাংলাদেশ আমাদের দেশ। জয় হোক সদাথর্ক ভাবনার, জয়ী হোক ইতিবাচকতা।

লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে

সন্দ্বীপ সুরক্ষা প্রকল্প: এক বছরেও শুরু হয়নি কাজ