জহুরুল হক হল আর জগন্নাথ হলে ছাত্ররা সশস্ত্র প্রতিরোধ করতে পারে, এ রকম একটা আশঙ্কা করেছিল পাকিস্তানিরা, অপারেশন সার্চলাইটের রাতে। ২৫ মার্চ সেই কালরাতে পাখির মতো মানুষ হত্যা করেছিল ওরা। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন এই দুই হলের মাঠে ছাত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে ঢাকা শহর যখন প্রকম্পিত, তখন চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। নিউ পল্টনে নিজের মেসে বসে নির্মলেন্দু গুণ দেখতে পাচ্ছিলেন আগুন। বুঝতে পারছিলেন, জহুরুল হক হলে চলছে বিভীষিকা।
২৭ মার্চ সান্ধ্য আইন উঠে গেলে রাস্তায় টহলরত পাকিস্তানি সেনাদের এড়িয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জহুরুল হক হলে গেলেন তিনি আর নজরুল ইসলাম শাহ। এই হলেই থাকতেন কবি হেলাল হাফিজ। আবুল হাসান, নজরুল ইসলাম শাহ আর নির্মলেন্দু গুণ এই হলে হেলাল হাফিজের কক্ষে কত রাত কাটিয়েছেন আড্ডা মেরে! হেলাল বেঁচে আছেন কি না, সেটা তখনো তাঁদের জানা নেই। প্রাণের ভয় ছিল, তারপরও আস্তে আস্তে তখন এই নারকীয় ঘটনা দেখতে মানুষ জড়ো হচ্ছিল হলে। হলের মাঠের একপাশে জড়ো করা হয়েছে লাশ। রক্তাক্ত দেহ। মুখ যন্ত্রণায় বিকৃত। ভালো করে চেনা যায় না। গভীরভাবে লাশগুলো খেয়াল করলেন নির্মলেন্দু। না, হেলাল হাফিজের লাশ নেই। কিন্তু লাশের সারিতে ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক চিশতী শাহ হেলালুর রহমানকে পাওয়া গেল। চিশতীও কবিতা লিখতেন।
এই ঘটনার দুদিন আগেও শরীফের ক্যানটিনে কবিতা নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। চিশতীর লাশের সারিতে ছিল আরও ১১টি লাশ। খুঁটিয়ে দেখলেন নির্মলেন্দু। না, হেলাল হাফিজের লাশ সত্যিই সেখানে নেই। একটু পর দেখা গেল, ছোট্ট একটি ব্যাগ হাতে হেলাল হাফিজ বেরিয়ে আসছেন হলের ভেতর থেকে। তাঁরা দুজন ছুটে গিয়ে আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরেন হেলাল হাফিজকে। তিনজনের চোখে তখন আনন্দাশ্রু।
সূত্র: নির্মলেন্দু গুণ, আত্মকথা ১৯৭১