হোম > ছাপা সংস্করণ

পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ইঙ্গিত

আলম শাইন

সৌরজগতে বিভিন্ন আকার-আকৃতি ও বিভিন্ন রঙের গ্রহের দর্শন মেলে। যদিও তা খালি চোখে দেখা যায় না, তথাপিও বিজ্ঞানীরা গ্রহগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছেন বিভিন্নভাবে দর্শনের মাধ্যমে। তাঁদের দেওয়া বর্ণনায় এবং ছবির মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি পৃথিবীটা চ্যাপ্টা গোলাকার, সবুজ রঙের; যা দেখতে কিছুটা কমলা ফলসদৃশ। সৌরজগতের যাবতীয় গ্রহের মধ্যে পৃথিবী হচ্ছে একমাত্র সুষম গ্রহ। বলা হয়ে থাকে, চারটি কঠিন বা শিলাময় গ্রহের মধ্যে পৃথিবী অন্যতম। 

তবে পৃথিবী শিলাময় হলেও সৌরজগতের একমাত্র সুষম গ্রহই হচ্ছে এটি। সুষম গ্রহের কারণেই এখানে রয়েছে প্রাণের অস্তিত্বসহ নানাবিধ উদ্ভিদের সমাহার। অন্যান্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একমাত্র পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তার কারণ একটাই—প্রকৃতি এ গ্রহটাকে বাসযোগ্য রাখতে পরিবেশ, জলবায়ু ও জীবজগতের ভারসাম্য বজায় রেখেই তৈরি করেছে। এমনকি সূর্যের প্রখর আলো যেন পৃথিবীকে উত্তপ্ত করতে না পারে, তার জন্য ওজোনস্তর সৃষ্টি করেছে। ওজোনস্তর হচ্ছে পৃথিবীর জন্য একধরনের ফিল্টার। সূর্যের প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রখর তাপ পৃথিবীতে সরাসরি পড়তে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তরের কারণে। এই ফিল্টারে ছেঁকে সূর্যের তাপমাত্রাকে বিশুদ্ধ করে পৃথিবীর জন্য ১০-৪২ (কম-বেশি হতে পারে) ডিগ্রি সেলসিয়াস পাঠায়। 

এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে, একমাত্র ওজোনস্তর বা ওজোন গ্যাস পৃথিবীকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। আর সেই ওজোনস্তরই এখন ধ্বংস হচ্ছে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের গ্যাসের প্রকোপে। তার মধ্যে অন্যতম গ্যাস, সিএফসি, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের নির্গমন বেড়ে যাওয়া। ফলে ওজোনস্তর ক্ষয় হয়ে ক্রমেই পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে। অথচ এই পৃথিবী ২৫ লাখ বছর আগে বরফের চাদরে আবৃত ছিল। যেই সময়টা আমাদের কাছে আজও বরফ যুগ হিসেবে পরিচিত। 

পৃথিবীতে এ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পাঁচটি বরফ যুগের আবির্ভাব ঘটেছে। তার মানে হচ্ছে, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন, তেমনি হ্রাসও পাচ্ছে শতাব্দী ধরে পালাক্রমে। বিজ্ঞানীদের অভিমত, বর্তমান সময় হচ্ছে একটি মাঝারি ধরনের বরফ যুগ। যেই যুগের শুরু হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৫০০ বছর আগে। তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ব্যাখ্যাটা হচ্ছে, এখনো মেরু অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক স্থানই বছরব্যাপী বরফে আবৃত থাকছে। মূলত সেই হিসাবেই বর্তমান যুগকে বরফ যুগ নামে আখ্যায়িত করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে; যাকে বলা হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। দেখা গেছে, কয়েক দশক ধরেই পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তেমনি

বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা জুলাই ২০২২ সালে ১৪ দশমিক ৭৬ সেলসিয়াসে উঠেছে।

ঐতিহাসিকভাবেই বছরের উষ্ণতম মাস হিসেবে জুলাই মাস বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। সেই পরিচিত মাসেই ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তীব্র দাবদাহ প্রবাহিত হয়েছিল। যেই তাপমাত্রা গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ২০২১ সালের রেকর্ডকে ১ দশমিক ১ সেলসিয়াসের ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছিল গত বছরের জুলাইয়ের তাপমাত্রা। 

উল্লেখ্য, বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ডের হিসাব-নিকাশ করেই যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জুলাই, ২০২১ ছিল ১৪২ বছরের মধ্যে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। অপরদিকে বিংশ শতাব্দীর জুলাই মাসের গড় তাপমাত্রার চেয়ে একবিংশ শতাব্দীর ২০২২ সালের জুলাইয়ের তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ২০১৫-২০২২ সাল পর্যন্ত জুলাইয়ের উষ্ণতা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) আবহাওয়াবিদ ‘আহিরা সানচেজ-লুগো’। 

চলতি বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালের বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়েও শঙ্কিত হচ্ছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস পূর্বাভাসে জানিয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে চলতি বছর। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০২৩ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়বে। পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হিমবাহের ধস নেমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। এ ছাড়া দাবদাহ, দাবানল, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কবলে পড়ে অনেক দেশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; বিশেষ করে অতিরিক্ত খরার কারণে বিশ্বের অনেক দেশের বনভূমি দাবানলের কবলে পড়বে। যেমন ২০২১ সালে আলজেরিয়া, তুরস্ক, গ্রিস, উত্তর আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র দাবদাহের ফলে মারাত্মক দাবানলের সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলেও একই বছর দাবানলের সৃষ্টি হয়েছিল। 

অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোও ২০২১ সালে দাবদাহের কবলে পড়েছিল। এর মধ্যে তীব্র দাবদাহ হয় ইতালিতে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ইতালির সিসিলি দ্বীপে ২০২১ সালে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল; ফলে ইউরোপের তাপমাত্রায় রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টা সাধারণ জনমনে প্রশ্ন তুলেছিল যদি শীতপ্রধান দেশের তাপমাত্রা এমন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, তাহলে মরু অঞ্চল বা 
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তাপমাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে! 

এ ধরনের অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন, সিএফসি, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, জ্বালানি তেল ও কয়লার ব্যবহার কমিয়ে না আনলে জলবায়ু পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটবে। বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংকও। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ গ্রাউন্ডসওয়েল (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১) প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, এ ধারায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটলে আগামী তিন দশকে সমগ্র বিশ্বে ২১ কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ৪ কোটি, মধ্য এশিয়া ৫০ লাখ, পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ৪ কোটি ৯০ লাখ, লাতিন আমেরিকায় ১ কোটি ৭০ লাখ, সাব-সাহারান আফ্রিকায় ৮ কোটি ৬০ লাখ ও উত্তর আফ্রিকায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে; যা মানবজাতির জন্য একটি বিশেষ সতর্কবাণী। সেটি মাথায় নিয়েই এখন আমাদের কাজ করতে হবে। বিশ্ববাসীকে প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে, খনিজ জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, সবুজায়নে প্রাধান্য দিতে হবে। তবেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, নচেৎ মানবজাতির জন্য পৃথিবীতে টিকে থাকাই দায় হবে।

আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে

সন্দ্বীপ সুরক্ষা প্রকল্প: এক বছরেও শুরু হয়নি কাজ