সমাজে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে আমরা বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের পরিচয় দিতে পছন্দ করি, নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির তাগিদে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যার পরিচয় দেওয়া হয়, তিনি কিন্তু তুলনায় নিম্ন অবস্থানের আত্মীয়ের পরিচয় দেওয়া পরের কথা, তাদের স্মরণেও রাখতে চান না।
পরস্পর থেকে আমরা ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। এর প্রভাব পারিবারিক পরিমণ্ডলে পর্যন্ত চলে এসেছে। এই বিচ্ছিন্নতা বিদ্যমান ব্যবস্থারই সৃষ্টি। ব্যবস্থাটিই আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যেকের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। একসময় অনেক পরিবারই একান্নবর্তী ছিল। এখন পরিবার বলতে ব্যক্তি এবং তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরই আমরা বুঝে থাকি।
মা, বাবা, ভাই, বোন পরিবারভুক্ত হিসেবে বিবেচনার অযোগ্য। যৌথ পরিবারে যৌথ ভাবনা ছিল। এখন সেটা নেই।
মধ্যবিত্ত সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক সম্পর্ক, আসা-যাওয়া, খোঁজখবর নেওয়ার একটা সংস্কৃতি ছিল; সেটাও এখন লুপ্তপ্রায়। এখন তো কেবল সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং কারও মৃত্যু উপলক্ষ করেই পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের সম্ভাবনা থাকে। এমনকি সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব-পার্বণে পর্যন্ত কেউ আর আগের মতো আত্মীয় বাড়িতে যায় না। মুঠোফোনে এসএমএস পাঠিয়ে কিংবা বড়জোর ফোনালাপে সামাজিক দায়িত্ব পালন করে।
পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ে আমরা হাসিঠাট্টা করতাম। পূর্ব বাংলার মানুষের অতিথিপরায়ণ ঐতিহ্যের অহংকার এবং সামাজিকতাও এখন কিন্তু আর আগের মতো নেই। আমরা বদলে যাচ্ছি, সংকুচিত হয়ে পড়ছি; সেই জাদুর কাঠির ছোঁয়ায়, যার নাম পুঁজিবাদ।
দুই
প্রবাদ আছে, মানুষ চোখের আড়াল হলে মনেরও আড়াল হয়ে যায়। সাধারণত মানুষে-মানুষে দূরত্ব স্থানচ্যুতির ক্ষেত্রে দেখা যায়। পাশাপাশি বাড়িতে, এক পাড়ায় একসঙ্গে বেড়ে ওঠার পর স্থান ত্যাগে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। চোখের আড়ালের কারণে তৈরি বিচ্ছিন্নতা সাধারণ বিচ্ছিন্নতা। অপরদিকে শ্রেণি দূরত্বের কারণে দৃষ্টিভঙ্গির যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়, সেটা স্থানচ্যুতির কারণে ঘটে না, ঘটে শ্রেণি-পার্থক্যের কারণে।
সমাজে বসবাসে শ্রেণিভেদ-বৈষম্য ক্রমাগত প্রকট হচ্ছে। উচ্চ, মধ্য, নিম্ন—শ্রেণিকাঠামো এই তিন ভাগে বিভক্ত হলেও তিনের ভেতর আরও ভাগ আছে। উচ্চবিত্তে তিনটি, মধ্যবিত্তে তিনটি এবং নিম্নবিত্তে তিনটি ভেদ রয়েছে। আরও একটি শ্রেণি রয়েছে—যাকে বলা যায় সর্বহারা। বাস্তবিক সত্য হচ্ছে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সব সম্পর্কের মূলে শ্রেণির ভূমিকাই প্রাথমিক।
কিশোর বয়সের একটি ঘটনা স্মরণে আছে। পাকিস্তান আমলের কথা। আমার এক আত্মীয় সদ্য বিয়ে করেছেন; আমি ওই বাসায় বিয়ে উপলক্ষে ছিলাম। আত্মীয়টির শ্বশুরবাড়ি থেকে অতিথিরা এসেছেন। এসেছে আমার চেয়ে অল্পবয়সী এক কিশোরও। ছেলেটি আমার আত্মীয়কে উদ্দেশ করে বলল, ‘আপনারা সবাই মিলে গল্প করছেন অথচ আমি একা। আমি খুবই লোনলি ফিল করছি।’ শুনে আত্মীয়টি আমার নাম ধরে ডাকলেন। কাছেই ছিলাম। আরও কাছে আসামাত্র তিনি আমাকে আপাদমস্তক পরীক্ষা করে হতাশ ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যাও।’ ছেলেটিকে নিয়ে তিনি ঘরে চলে গেলেন। কারণটি অস্পষ্ট রইল না। আমি মাধ্যমিকের ছাত্র, আর ওই ছেলেটি পাকিস্তানি আমলে ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্র। তার বাবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী এবং পরিবারটির শ্রেণি-অবস্থান আমার সেই আত্মীয়ের তুলনায় উঁচুতে। আমাকে ডেকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি অত্যন্ত শ্রেণিসচেতন।
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার লালবাগে। সেখানে সবাই সবাইকে চেনে-জানে। বংশপরম্পরায় এখানে বসবাস করায় প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের বেশ সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য, যা নতুন ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নেই। আমার বড় বোন আজিমপুর গার্লস স্কুলে পড়ত। সহপাঠীদের প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। এই বান্ধবীদের সঙ্গেই পড়াশোনার বাইরে তাদের সর্বাধিক সময় কাটত। স্কুলে আসা-যাওয়া করত একই সঙ্গে। ছুটির দিনে এর বাড়ি-ওর বাড়ি যাওয়া-আসা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।
নিকট প্রতিবেশী এক বান্ধবীর সঙ্গে আমার বোনের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। তার সঙ্গে এক যুগের বেশি সময় কাটিয়েছে সে। স্কুল শেষে ইডেন কলেজেও তারা একসঙ্গেই পড়েছে। বান্ধবীটির বিয়ে হয় পুরান ঢাকার বাসাতেই। স্বামীসহ তারা বেশ কিছুদিন সেখানেই ছিল। স্বামীর সরকারি চাকরির কারণে পরে তারা নতুন ঢাকায় চলে যায়। স্বামীর উচ্চপদস্থতার কারণে তাঁর জীবনযাপনে বদল ঘটে। স্বামী ক্রমেই বড় আমলা হয়ে ওঠেন। আমার বোনের সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক আর থাকেনি। দুজন দুদিকে ছিটকে পড়ে।
কালে-ভদ্রে দেখা হয়। যেমন দেখা হয়েছিল ঢাকার নিউমার্কেটে। বান্ধবীকে দেখামাত্র আমার বোন আবেগে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার বান্ধবীটি বেশ সংযত। দুই কদম পেছনে সরে আমার বোনের অতি আবেগ থেকে নিজেকে তিনি রক্ষা করেন। সঙ্গের নারী তাকে আমার বোনের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বান্ধবীটি চরম নির্লিপ্ততায় বলেছিল, ‘আমরা একসময় পাশাপাশি থাকতাম।’ শুনে আমার বোনের আবেগ-উচ্ছ্বাস মুহূর্তে উধাও। তার মুখে আর শব্দ নেই। একরকম পালিয়েই এসেছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা আমাকে সে বলেছে।
তিন
ছোটবেলায় ইশপের সারস শিয়ালের বন্ধুত্বের গল্পটি পড়েছিলাম। পশু এবং পাখির ভেতর বন্ধুত্ব হয়েছিল বটে, তবে একে অপরের গৃহে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে তারা চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়ে। খাবার খেতে পর্যন্ত পারেনি। পশু ও পাখির এই অসম বন্ধুত্বের সারবস্তু তখন ঠিক বুঝিনি। মানুষে মানুষে শ্রেণি-পার্থক্যের উপমা হিসেবে গল্পটি খাপ খায়। শ্রেণিবিভাজন অতিক্রম করে মানুষের সঙ্গে মানুষের, সম্প্রীতি, হৃদ্যতা, অনাবিল আন্তরিকতার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটা সম্ভব নয়।
সমাজে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিস্তার ঘটেছে বৈষম্যের ও বিচ্ছিন্নতার। একান্নবর্তী পরিবারে ভাইবোনেরা পরস্পর যেভাবে আন্তরিকতায় বেড়ে ওঠে, পরবর্তী জীবনে সেই ভালোবাসায় ভাটির টান পড়ে পরিবারের সদস্যদের ভেতর অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে। একই মা-বাবার সন্তানদের মধ্যে কেউ যদি অন্যদের তুলনায় বিত্তশালী হয়ে ওঠে, তবে অন্য ভাইবোনদের থেকে তার বিস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে যায়। বদলে যায় দৃষ্টিভঙ্গি এবং আত্মীয়তার জগৎ। অনাত্মীয় হয়ে পড়ে আত্মীয় আর নিকটাত্মীয় হয়ে যায় অনাত্মীয়।
সমাজে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে আমরা বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের পরিচয় দিতে পছন্দ করি নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির তাগিদে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যার পরিচয় দেওয়া হয়, তিনি কিন্তু তুলনায় নিম্ন অবস্থানের আত্মীয়ের পরিচয় দেওয়া পরের কথা, তাদের স্মরণেও রাখতে চান না। একটি ঘটনার কথা শুনেছিলাম। বিত্তবান ভাইয়ের বাড়ির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিম্নবিত্ত এক ভাই। পথচারী একজন বিশাল ওই বাড়িটির মালিক কে জানতে চাইলে ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইটি সগর্বে বলে ওঠেন, ‘কেন, আমাদের বাড়ি।’
পথচারীটি বলেন, ‘ভাই, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে, এক গ্লাস পানি খাওয়াবেন?’ ভীষণ বিপদ-সংকোচে পড়ে যায় নিম্নবিত্ত ভাইটি। অগত্যা সত্য কথাটি বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে। ‘ভাই, দুঃখিত, অনুমতি ছাড়া বাড়ির ভেতরে যাওয়ার আমার উপায় নেই। আমি অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।’ জানি না, এটি সত্য ঘটনা, না গল্প। অসত্য নয় বলেই মনে হয়।
নিকটাত্মীয়ের ঘনঘন চাকরির দাবিতে বাধ্য হয়ে উচ্চমধ্যবিত্ত এক ব্যক্তি নিজেদের যৌথ মালিকানার অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের একটিতে হিসাবরক্ষকের চাকরি দেন। তবে ছেলেটির আত্মীয় পরিচয় গোপন রেখে অংশীদারদের কাছে পরিচয় দেন গ্রামের ছেলে বলে। ছেলেটি আত্মীয়ের বাড়িতে ঠাঁই পায়নি। মেসে থেকে চাকরি করছে। এমনকি সেই আত্মীয়র বাড়িতে এক দিনের জন্যও তার প্রবেশ ঘটেনি। এটিও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্নও নয়।
লেখক: মযহারুল ইসলাম বাবলা, নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত