হোম > ছাপা সংস্করণ

রাজনীতিতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রসঙ্গ

মহিউদ্দিন খান মোহন

১৯৬৯ সালে আমি ছিলাম পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। সে সময় স্বৈরশাসক আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান প্রকম্পিত। থানা সদর শ্রীনগরে ছিল আমাদের স্কুল। শ্রীনগর ও পার্শ্ববর্তী ষোলঘর হাইস্কুলের সিনিয়র ছাত্ররা মিছিল বের করতেন প্রায় প্রতিদিন।

তাঁদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমরাও স্লোগান ধরতাম—‘আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক রশিতে ফাঁসি চাই’, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’, ‘আসাদের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’ ইত্যাদি।

আমার বড় ভাই গিয়াসউদ্দিন খান বাদল পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর মুখেই প্রথম নাম শুনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও গরিব-দুঃখী, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের পক্ষে আপসহীন সংগ্রামের কাহিনি শুনতে শুনতে কখন যে তাঁর ভক্ত হয়ে গেলাম টেরই পাইনি। তিনিই ছিলেন আমার প্রথম রাজনৈতিক নেতা; যাঁকে আমি বলি আমার রাজনৈতিক পীর। শুধু আমি কেন, এ দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদের তিনি ছিলেন শিক্ষক-দীক্ষাগুরু। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীর সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য ছিলেন।

শেখ মুজিবও মওলানা হুজুরকে পিতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। একপর্যায়ে দুজনের রাজনৈতিক পথচলা আলাদা হয়ে গেলেও সেই সম্পর্ক ছিল অক্ষুণ্ন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ সেই সময়ের বাঘা বাঘা নেতারা মওলানা ভাসানীকে সম্মান ও সমীহ করতেন।

সে সময় গোটা বাংলাদেশের গণমানুষের মধ্যে মওলানা ভাসানীর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ছিল ব্যাপক। যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে ‘মওলানা হুজুর’ কী বলেন, তা শোনার বা জানার জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন সবাই। অথচ তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না।

অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। তারপর আর লেখাপড়া করা হয়নি। নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন নিপীড়িত মানুষের পক্ষে লড়াইয়ে। খেতাব পেয়েছেন ‘মজলুম জননেতা’র। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁর অনেক কাজের বিরোধিতা করেছেন, সমালোচনা করেছেন। কিন্তু কেউ তাঁকে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত বলে গালি দেননি বা কটাক্ষ করেননি। কেননা, রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি ও দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি।

তবে হ্যাঁ, বর্তমান সময়ে রাজনীতি করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখতে হলে শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সনদ না থাকলেই একজন মানুষ এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে পারে না, এমনটিও নয়।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-সনদহীন বহু মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছেন–এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। সর্বশেষ আমি যে দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), এর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ারও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-সনদ নেই। তিনি নিজেকে স্বশিক্ষিত বলে পরিচয় দিতে কখনোই কুণ্ঠিত হননি।

যদিও তাঁর প্রতিপক্ষের কেউ কেউ এটা নিয়ে তাঁকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। তবে তিনি সেসবের কোনো প্রত্যুত্তর করেননি কখনো। তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুবাদে আমার একটা প্রতীতি জন্মেছে যে, খালেদা জিয়া তাঁর মার্জিত আচার-আচরণ, সংযমী কথাবার্তার কারণে অনেক তথাকথিত শিক্ষিতজনের চেয়ে সম্মানীয়। তাঁর নেতৃত্বে বহু উচ্চশিক্ষিত মানুষ নির্দ্বিধায় কাজ করেছেন দলে এবং সরকারে।

রাজনীতিতে কতগুলো অলিখিত নিয়ম আছে, যেগুলো সংশ্লিষ্টদের মেনে চলতে হয়। কারও সমালোচনা করতে গিয়ে এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যাতে সেই ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটে, তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা প্রতীয়মান হয়। অবশ্য আমাদের রাজনীতিকদের অনেকেই কথা বলতে গিয়ে এতটাই প্রগলভ হয়ে ওঠেন, কখন যে তাঁরা শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করেন, তা খেয়াল করেন না।

তেমনি একটি মন্তব্য করে বিপাকে পড়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি এ সময়ের আলোচিত-সমালোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলম সম্পর্কে অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করে এখন মানহানি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। ৭ আগস্ট পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, রিজভী রাজশাহীতে তাঁর এক বক্তৃতায় হিরো আলমকে ‘অর্ধপাগল ও অশিক্ষিত’ বলে মন্তব্য করায় ৬ আগস্ট তিনি ডিবি কার্যালয়ে গিয়েছিলেন মামলা করতে।

কিন্তু এ ধরনের মামলা নেওয়ার এখতিয়ার ডিবির নেই বিধায় ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশীদ তাঁকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ৭ আগস্ট হিরো আলম রিজভীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেছেন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। আদালত মামলা গ্রহণ করে ডিবিকে ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

রিজভীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হিরো আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘রিজভী যে দলের নেতা, সেই দলের নেত্রীও তো ক্লাস এইট পাস, আমি সেভেন পাস।’ হিরো আলম প্রশ্ন করেছেন, তিনি (হিরো আলম) যদি পাগল বা অর্ধপাগল হতেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন কি তাঁকে নির্বাচন করার সুযোগ দিত?

অকাট্য যুক্তি। কেননা, আমাদের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ ২-এ যে সাতটি কারণে কারও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য বিবেচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে প্রথমটি হলো, ‘যদি কোনো উপযুক্ত আদালত তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন।’ হিরো আলমকে বাংলাদেশের কোনো আদালত পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেননি। সুতরাং হিরো আলমকে পাগল বলে মন্তব্য করে রিজভী সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘন করেছেন বলে ধরে নেওয়া যায়।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসনদ না থাকলেই যদি তিনি অশিক্ষিত বলে বিবেচিত হন, তাহলে বলতে হয়, বহু অশিক্ষিত মানুষ আমাদের রাজনীতির উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। রিজভীর কাছে শিক্ষিত-অশিক্ষিতের সংজ্ঞা কী, তা আমার জানার কথা নয়। তবে জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলে থাকেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট থাকলেই কাউকে শিক্ষিত বলা যায় না।

হতে পারে সে লেখাপড়া জানা মানুষ, তবে শিক্ষিত নয়। একজন শিক্ষিত লোক কারও মানহানি হতে পারে, সম্মানে আঘাত লাগতে পারে—এমন কথা কখনোই বলবেন না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা আমাদের আশপাশে এমন অনেক ‘শিক্ষিত’ মানুষের দেখা পাই, যাদের মুখের ভাষা শুনলে কান গরম হয়ে যায়, লজ্জায় মুখ লুকাতে ইচ্ছে করে। তখন মনের অজান্তেই স্বগতোক্তি বেরিয়ে আসে—লোকটা নাকি শিক্ষিত!

একজন স্বশিক্ষিত নারীর কথা বলে আজকের লেখার ইতি টানব; যাঁর কাছে আমার শিক্ষার হাতেখড়ি। তিনি আমার মা। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। বাড়িতে মৌলভি সাহেবের কাছে বাল্যকালে যতটুকু পড়েছেন। তিনি আমাকে এমন একটি উপদেশ দিয়েছিলেন, যা আজও আমি মেনে চলার চেষ্টা করি। ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। স্কুল বন্ধ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অনেকটাই আমাদের মুখস্থ। ভুট্টো তখন আমাদের কাছে এক ভয়ংকর খারাপ লোকের নাম। খেলার সময় কেউ কারও কথা না শুনলেই আমরা বঙ্গবন্ধুর অনুকরণে বলতাম, ‘তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।’

সেদিনও আমাদের বাড়ির পাশের আমবাগানে আমরা খেলছিলাম। খেলা নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে আমি বলে উঠলাম, ‘তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো শালার কথা।’ আমার মা কোনো কাজে পুকুরঘাটে যাচ্ছিলেন। তিনি এসে আমাদের বললেন, ‘ভুট্টোর লগে যাঁর “কাইজ্জা”, হেই নেতা শেখ মজিবর দেহি তারে আপনে কইরা কয়। তরা গালি দেস ক্যান? বড় মানুষগো সন্মান (সম্মান) করতে শিখিস।’ আমার স্বশিক্ষিত মায়ের সেই উপদেশ আমি আজও মনে রেখেছি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট নেই বলে আমার মাকে কি আমি অশিক্ষিত বলব? 

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে