বাংলাদেশের অন্যতম মুদ্রণ সংস্থা অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল ইসলাম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কাগজের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনন্যা এবারের বইমেলায় নতুন বই প্রকাশ করতে পারছে না। এ জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
কিছুদিন আগে ছোট-বড়-মাঝারি মিলিয়ে অন্তত ৫০ জন লেখক-প্রকাশক কাগজের অত্যধিক দাম বাড়ার কারণে আসন্ন বইমেলায় বইয়ের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত বছর ‘মহাভারতের গল্প’ নামে একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলাম। চমৎকার প্রচ্ছদও এঁকে দিয়েছিলেন সব্যসাচী মিস্ত্রী। এমন সময় ভর করল আলস্য। প্রকাশক বারবার ফোন দিলেন পাণ্ডুলিপির জন্য। বললাম, আরও ঠিকঠাক করে আগামী বছর দেব। পাণ্ডুলিপি এবার ঠিকঠাক। আকারে-ইঙ্গিতে জানালাম প্রকাশককে। শুনেও না শোনার ভান করলেন তিনি।
কয়েক দিন আগে একটি প্রতিবেদন দেখলাম। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন কোম্পানির মিলে উৎপাদিত সৃজনশীল প্রকাশনাগুলোর অন্যতম প্রধান উপকরণ ‘প্রিন্টিং পেপার’-এর দাম কয়েক মাসে দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেছে। প্রকাশনায় সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ৮০ গ্রামের প্রিন্টিং পেপারের দাম দুই মাসে প্রতি রিমে প্রায় এক হাজার টাকা বেড়েছে। বছরের শুরুতে যে কাগজ খুচরায় বিক্রি হতো ১ হাজার ৮০০ টাকা রিম, সেই একই কাগজ বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। শুধু কাগজের দামই নয়, বোর্ড পেপার, কালি, প্লেট, বাঁধাইয়ের দামও বেড়ে গেছে। কয়েক মাসে কালির দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।কভার বাঁধাইয়ের বোর্ডের দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ।
১০ ফর্মার একটি বইয়ের ৫০০ কপির সংস্করণে যেখানে মানভেদে আগে উৎপাদন খরচ পড়ত ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মতো, এখন সেই বই ন্যূনতম মানের কাগজে ছাপাতেই সব মিলিয়ে খরচ পড়বে ৩৫-৪০ হাজার টাকার বেশি। ১০০ গ্রামের কাগজে প্রিন্ট করলে এই খরচ ৫০ হাজার টাকার কাছাকাছি চলে যাবে।
একজন জনপ্রিয় লেখকের কয়েক হাজার বই ছাপা আর আরেকজন লেখকের তিন শ বা পাঁচ শ বই ছাপার খরচটা কিন্তু এক নয়। তিন শ বই বা কয়েক হাজার বইয়ের জন্য কিন্তু একই প্লেট বা প্রচ্ছদের খরচ দিতে হয়। পার্থক্যটা শুরু কাগজ আর প্রিন্টিংয়ে। কয়েক হাজার যে বইটি ছাপা হয় তার প্রতিটি তৈরির যে খরচ, সেটার তুলনায় যে বই তিন শ ছাপা হয় তার প্রতি কপি তৈরির খরচ বেশি।
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরেক দফা বেড়েছে কাগজের দাম। কয়েক দিন আগেও ৮০ গ্রাম অফসেট কাগজের দাম ছিল ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। সেই কাগজের দাম ৫২০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৩২০ টাকা হয়ে গেছে। এ ছাড়া দেড় মাস আগেও দেশে প্রস্তুত হওয়া দুই ধরনের ৮০ গ্রাম অফসেট কাগজের দাম ছিল টন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। আর সেটা এখন ১ লাখ ২৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা টন বিক্রি হচ্ছে; অর্থাৎ দেড় মাসের ব্যবধানে টনে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেড়েছে।
প্রকাশনা উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগে যে বইয়ের দাম ২০০ টাকা রাখা যেত, আগামী বইমেলায় সেই একই বইয়ের দাম রাখতে হবে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। না হলে নির্ঘাত লোকসান গুনতে হবে।
যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে দেশের কাগজের মিলমালিকেরা স্বেচ্ছাচারিতায় নেমেছেন। প্রতিবছর একুশে বইমেলার আগে কাগজের মিলমালিকেরা সম্মিলিতভাবে কাগজের দাম বাড়িয়ে দেন।
এই বাড়তি খরচ সামঞ্জস্যে আনতে কোনো প্রকাশনী হয়তো নিজের লাভের মার্জিন কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে। আবার কোনো কোনো প্রকাশনী পুরোটাই চাপিয়ে দেবে পাঠকের ওপর।
করোনা পরিস্থিতির পর সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৩ সালেই প্রথম স্বাভাবিক সময়ে বইমেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মেলা উপলক্ষে দেশীয় প্রকাশনীগুলোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। দেশে বই বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুমে বইয়ের বাড়তি দামে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে লেখক-পাঠক-প্রকাশকের কপালে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে চারদিকে হাহাকার, সবকিছুর দাম বেড়ে গেলেও বাড়ছে না আয়। এমন পরিস্থিতিতে বাড়তি দামে বই কেনাটা সাধারণ পাঠকের জন্য বাড়তি বোঝা। কাগজের দামের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে যেভাবে বাড়তে চলেছে বইয়ের দাম, সে ক্ষেত্রে বই কেনার চাহিদায় বড়সড় পরিবর্তন আসবে।
‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’, কিন্তু দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিতে দেউলিয়া হওয়ার পথে এসে কয়জন উচ্চমূল্যে সৃজনশীল বই কিনতে রাজি হবেন, সেটাই ভাবার বিষয়। বই বিক্রি না হলে বই ছেপে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি নেবেন কয়জন প্রকাশক?
লেখক: শিশুসাহিত্যিক