ছেলেবেলায় জসীমউদ্দীনকে যখন তাঁর বাবা বললেন, পাঠশালায় যেতে হবে, তখন আতঙ্কে নীল হয়ে গেলেন তিনি। সেই গ্রামের কেউই স্কুলে যেত না। সমবয়সীদের কাছে শুনেছেন, মাস্টারের সামনে গেলেই নানা ধরনের শাস্তি পেতে হয়। কথা ছিল, তাঁকে এবং তাঁর চাচাতো ভাই নেহাজউদ্দীনকে নিয়ে বাবা যাবেন পাঠশালায়।
কীভাবে স্কুল বা পাঠশালা নামের বিভীষিকার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, সেটা ভাবতে থাকলেন জসীম ও নেহাজ। তাঁরা ভাবতে লাগলেন, পাঠশালায় ভর্তি হলে সারা দিন আর নদীতে সাঁতার কাটা যাবে না, ডুমকুরগাছে ডুমকুর পাকবে, গাবগাছে গাব পাকবে, কাঁদিভরা খেজুর পেকে লাল টুকটুকে হবে, কিন্তু তাঁরা সেগুলো পাড়তে পারবেন না। অন্য মানুষ এসে তা পেড়ে নিয়ে যাবে! আর তখন পাঠশালার কঠিন কারাগারে তাঁদের বন্দিজীবন কাটাতে হবে!
বাবাকে খুব ভালোবাসতেন জসীমউদ্দীন। বাবাও তাঁকে ভালোবাসতেন। অসুখ হলে বিছানার পাশে বসে পাখা দিয়ে বাতাস করতেন। খুশি করার জন্য মেলা থেকে পুতুল কেনার জন্য পয়সা দিতেন। সেই বাবাই কিনা এ রকম নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারলেন!
প্রথম দিন তাঁরা দুজন পালিয়ে গেলেন আখের খেতে। দুই পাশের আখ ভেঙে চিবিয়ে চিবিয়ে মুখে ঘা করে ফেললেন। যখন বুঝলেন, বাবা চলে গেছেন স্কুলে, তখন ফিরে এলেন বাড়িতে। এরপর কোনো দিন আখের খেত, কোনো দিন কলাইয়ের খেতে আত্মগোপন করে থাকতে লাগলেন। আত্মগোপন করে পাঠশালাকে এড়িয়ে যাওয়া হতো।
একদিন সরষের খেত থেকে গ্রেপ্তার হলেন জসীম ও নেহাজ। পাকড়াও করে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হলো পাঠশালায়। তখন পাঠশালার দু-তিনটি ছেলে নীলডাউন, হাফ নীলডাউন হয়ে রয়েছে। মাস্টারমশাইয়ের হাতে বেত। কিন্তু বাবাকে দেখে শিক্ষক উঠে দাঁড়ালেন। ছাত্ররাও উঠে দাঁড়াল। শাস্তি পাওয়া ছাত্রদের শাস্তিও মওকুফ হয়ে গেল।
মাস্টারমশাই খুব স্নেহ করলেন তাঁদের। জসীম বুঝলেন, পাঠশালা ততটা খারাপ কিছু নয়।
সূত্র: জসীমউদ্দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা ২৩-২৪