দীর্ঘদেহী, সব সময় ধুতি ও বাংলা শার্ট পরিহিত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কেই আমরা দেখেছি। এটাই ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সিগনেচার ড্রেস। এই দীর্ঘদেহী মানুষটিকে নিয়ে সংগীতজগতে অনেক গল্প প্রচলিত। তিনি একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েছিলেন অনুষ্ঠান করতে। প্লেন থেকে সেখানে নামার আগমুহূর্তে কোট ইত্যাদি বদলে তাঁকে চিরচেনা ধুতি-শার্ট পরে নিতে হয়েছিল। হেমন্তকে একবার ছুঁয়ে শ্রোতারা বলছিলেন, ‘আমরা ইন্ডিয়াকে স্পর্শ করছি।’ ওস্তাদ আমীর খাঁ এসেছিলেন তাঁর গান শুনতে। স্বভাব বিনয়ী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ওস্তাদজি তাঁকে বললেন, ‘মাইক্রোফোন থেকে আপনার স্বর ঈশ্বরের কণ্ঠ মনে হয়।’ হেমন্ত বাবুর কণ্ঠ নিয়ে এ রকম একটা কথা সলিল চৌধুরীও বলেছিলেন।
আর মান্না দে বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে যত্ন করে একটা গান তৈরি করি, গাই; আর হেমন্ত বাবু কথা বললেই গান হয়ে যায়।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালির ঘরে তো বটেই, সমগ্র ভারতবর্ষের অধিকাংশ মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করছেন অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে। তিনি যে কেবল কণ্ঠশিল্পী তা নয়, তিনি ভারতবর্ষের একেবারে শীর্ষ মানের একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালকও। তাঁর সুরে গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মান্না দে, হৈমন্তী শুক্লা, মুকেশ, কিশোর কুমারসহ প্রায় সব বিখ্যাত শিল্পী। বাংলায় নন ফিল্মি আধুনিক, চলচ্চিত্রের গান, রবীন্দ্রসংগীত, রজনীকান্তের গান, দ্বিজেন্দ্র গীতিসহ নানা ধারায় তিনি গেয়েছেন অসংখ্য কালোত্তীর্ণ গান। হিন্দি চলচ্চিত্র, অর্থাৎ বোম্বেতে তাঁর সাফল্য ছিল বিস্ময়কর। প্রথম দিকে ব্যবসা অসফল কিছু সিনেমার পরে ১৯৫৪ সালে ‘নাগিন’ মুক্তি পায়। নাগিনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের করা সুরে পুরো ভারতবর্ষ মেতে ছিল কয়েক যুগ! সত্যি বলতে, সেই গানের সুরের প্রভাব এখনো আছে।
তাঁর জীবনে অসংখ্য পুরস্কার তিনি পেয়েছেন, সেই সব এখানে উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী (১৯৭০) ও পদ্মভূষণ (১৯৮৭) পুরস্কার দিতে চাইলেও তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। শিক্ষিত বাঙালির ঘরে রেডিওতে, গ্রামোফোনে বা ক্যাসেটে কখনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’, ‘ও নদী রে’, ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’, ‘আজ দুজনার দুটি পথ’ বা ‘কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো’ বাজেনি—এ অসম্ভব! শিক্ষিত বাঙালির রুচি, স্বাদ তৈরিই হয়েছে এসব অতুলনীয় গান শুনতে শুনতে। আজ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন। বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
জাকির হোসেন তপন, সংগীতশিল্পী