শীতের আমেজ এখনো ফুরোয়নি। মাঘের কণ্ঠে বিদায়বেলার ভৈরবীটাও শৈত্যপ্রবাহের খবরে মোড়ানো। প্রকৃতি যেমনই হোক, পঞ্জিকার পাতা তো ওলটাবেই। অতএব, বাংলার ঋতুরাজ বসন্ত এসে গেছে। আজকের এই বিশ্বায়ন, ইন্টারনেটের যুগে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও বাঙালির উৎসব-আতিথেয়তা কিন্তু হারিয়ে যায়নি। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের যুগে ষড়্ঋতুকে আজকাল আর আলাদা করতে না পারলেও তার জন্য তুলে রাখা আদরের তো কমতি নেই। প্রতিটি ঋতুকেই তাই আমরা বরণ করে নিই তার নিজস্বতার সুরে। পয়লা বৈশাখ থেকে পয়লা বসন্ত—প্রতিটি উৎসবে-পার্বণেই সাজানো থাকে বাঙালির বরণডালা। বসন্তবরণে এই রং যেন আরও রঙিন হয়ে ওঠে। ঋতুরাজ বলে কথা!
দোলপূর্ণিমায় বসন্ত উদ্যাপন হয় বহু যুগ ধরে, তবে তা ছিল অনেকাংশেই একটি ধর্মীয় আচার। প্রকৃতির এই বর্ণিল সময়কে সর্বজনীন উৎসবে রূপ দিল পয়লা ফাল্গুনের বসন্তবরণ আয়োজন। এখানেও বাঙালিকে পথ দেখালেন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর সময় থেকেই নৃত্যগীতি আর উৎসবের আয়োজনে বরণ করে নেওয়া হয়েছে বসন্তকে। স্বাধীন বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্তবরণ উৎসব শুরু হয় ১৪০১ বঙ্গাব্দ থেকে। কিন্তু বসন্ত তো বাঙালির প্রাণের ঋতু, রঙের ঋতু; তাই ব্যক্তিগত পরিসরে কী নিজস্ব আঙিনায় বসন্তবরণ বাঙালির পুরোনো ঐতিহ্য। ১৪০১ বঙ্গাব্দে প্রকৌশলী শফি উদ্দীন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজল দেবনাথ ও আরিফ হোসেন বনি তাঁদের স্বপ্নকে সফল করতে মাথার ওপরে ছায়া হিসেবে পেয়েছিলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় সংস্কৃতিজন ওয়াহিদুল হককে। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে আহ্বায়ক ও প্রয়াত আবৃত্তিশিল্পী কাজী আরিফকে সদস্যসচিব করে গঠিত হয়েছিল জাতীয় ‘বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পর্ষদ’। পয়লা ফাল্গুন ভোরবেলা চারুকলার বকুলতলায় যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে বসন্তকে আবাহন করে আয়োজন শুরু হয় প্রতিবছর। তারপর গীত, বাদ্য, নৃত্য, আবৃত্তি ও কথনে দিনব্যাপী চলে বর্ণিল অনুষ্ঠান। এই ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটেনি ১৪২৫ সাল পর্যন্ত; বরং এ বছরগুলোয় বসন্ত উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। ফাগুনের প্রথম দিনটিতে হলুদ শাড়ি বা পাঞ্জাবি পরার কথা কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয় না। ব্যবসায়ীরা ফাগুন আসার আগেই হলুদ রঙের কাপড়ের দোকান সাজিয়ে তোলেন। ফুলের দোকানগুলো নানা ধরনের ফুলের মালায় সেজে ওঠে। আবিরের রং প্রকৃতির রঙের সঙ্গে মিলেমিশে আরও একটু আনন্দ ছড়িয়ে দেয় বাতাসে। ছুটির দিন না হয়েও পয়লা ফাল্গুনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অলিখিত ছুটির আমেজ থাকে। ফেব্রুয়ারির অমর একুশে বইমেলা বর্ণিল হয়ে ওঠে এই পয়লা ফাল্গুনে। বসন্তের ফাগুয়ার রং ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে, মন আপনাতেই যেন গেয়ে ওঠে—‘...লাগল যে দোল/স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল...’।
দুই. আমাদের সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক উৎসবগুলোর বেশির ভাগই ঋতুভিত্তিক উৎসব। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের তীব্র প্রতিবাদ ছিল পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ আর প্রতিবাদী রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন। সেই আন্দোলন ছিল এ ভূখণ্ডের মানুষের মুক্তির আন্দোলনের অংশ। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষকে একটি অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত করার প্রয়াসেই ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো উদ্যাপন প্রয়োজন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় উদ্যাপনের এই মেলবন্ধন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুরুতে পয়লা ফাল্গুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ১৩ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো এবং এদিনই উদ্যাপিত হতো বসন্তবরণ। দুই বছর ধরে বাংলা ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন আসায় পয়লা ফাগুন হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি, যা একাধারে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবেও পালিত হয় বাংলাদেশে। ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল, ছাত্রবন্দীদের মুক্তি এবং গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন শহীদ জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, আইয়ুব, কাঞ্চন ও দীপালি সাহা। এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতিতে আন্দোলন ও উদ্যাপনের পাশাপাশি চলন বহু যুগের। বাঙালির ভালোবাসার দিন পয়লা ফাল্গুনে তাই অধিকার আদায়ে দীপালি, কাঞ্চনসহ শহীদদের ত্যাগকে বুকে ধারণ করে, সাংস্কৃতিক সব আগ্রাসনকে প্রতিহত করে আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে লালনই হয়ে ওঠে আমাদের লক্ষ্য। ফাগুন বাংলার মানুষের আন্দোলনের মাস, হারানোর বেদনা থেকে উৎসারিত অর্জনের মাস। পাতা ঝরার দীর্ঘশ্বাসের পর প্রস্ফুটিত সুবাসিত রঙিন সময়। ৮ ফাল্গুনের রাজপথের রক্তই মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। আরেক ফাগুনে দেশ থেকে রাজাকার নির্মূলের সাফল্য আসে স্বজন হারানোর মূল্যে। তাই আগুন ঝরা ফাগুন এ দেশবাসীর প্রাণের মাস।
বসন্ত উৎসব উদ্যাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উত্তর ও পূর্ব প্রজন্মের রাখিবন্ধন। এই বন্ধন দুই প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্কের সেতু রচনা করে। একে অন্যকে বুঝতে চেষ্টা করে। ফলে ঘুচে যায় ব্যবধান। আনন্দের আরেক উচ্ছ্বাস থাকে আবিরে—বাতাস রাঙানোর পাশাপাশি একে অন্যকে রাঙিয়ে তোলার অনাবিল এ আনন্দ তো ফাগুনেরই দান। চারুকলার বকুলতলা প্রতিবছর এ দিনটি ফাগুয়ার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
গত দুই বছরের ফাল্গুনে আমাদের উচ্ছ্বাস ছিল বেশ সীমিত, খানিকটা শৃঙ্খলিতও। স্বাস্থ্যের প্রশ্নে পৃথিবীর মানুষ আজ এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। বেশ কিছুদিন যাবৎ সবকিছুই চলছে সীমিত ও স্বল্প পরিসরে। তাই এবারের বসন্তবরণ নিয়ে হৃদয়ে উৎসাহ আর আনন্দের সীমা না থাকলেও জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পর্ষদের উদ্যাপনটি একটু সীমিত হচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে পয়লা ফাল্গুন সকাল ৭টা থেকে শুরু হবে উৎসব। সীমিত পরিসরে আয়োজিত হলেও এই কংক্রিটের শহরে বসন্ত আসছে প্রাণের উচ্ছ্বাস নিয়ে। হারানোর বেদনা, রোগ-শোকের কষ্টকে ছাপিয়ে বাসন্তী বসনে মাথায় ফুল গুঁজে উৎসবে উপস্থিত হয়ে বর্ণিল প্রকৃতির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরা গাইব, ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’।
যাঁরা কর্মস্থলে বা অন্য কোনো ব্যস্ততায় থাকবেন, তাঁদের পোশাকে হলুদের ছোঁয়া থাকবেই জানি। কোকিলের কুহু শুনে আপনার উন্মনা মনটাই গেয়ে উঠবে, আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।