আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলায় কথা কই, কারণ আমি বাঙালি।
ভাষা আন্দোলনের প্রায় ৬৮ বছর হলেও আমরা মাতৃভাষাকে মর্যাদা দিতে শিখিনি। আমার মনে হয়, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সমাজের সর্বস্তরে এর সঠিক প্রয়োগ, এর প্রচার, প্রসার ও উন্নয়নে কিছুটা হলেও ভাষাশহীদদের রক্তের ঋণ শোধ হবে।
নতুন প্রজন্মের কাছে মায়ের ভাষা তথা মাতৃভাষা বাংলার গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে হবে। সেটা করা হলে তারা মাতৃভাষা বাংলার চর্চা, পরিচর্যা ও ব্যবহারে আরও আগ্রহী হয়।
তারপর বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে রয়েছে হৃদ্যতা। ভাষার মধ্যে যে হৃদয়ের ছোঁয়া রয়েছে, তা বোঝা যায় যখন কেউ তার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। আমার মনে হয়, আঞ্চলিক ভাষা হচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা। আর সর্বজনীন বাংলা যা বইতে লেখা রয়েছে, তা হচ্ছে জাতীয় ভাষা।
বিতর্ক তৈরি করার জন্য এ লেখা নয়, শুধু অন্যদের সঙ্গে ভাগ করতে চাই আমার অনুভূতিকে, যখন আমি নহাটার (নড়াইল, মাগুরা, যশোর) ভাষায় কথা বলি। আমি জানি এবং শুনেছি অনেকেই বলাবলি করে, আমি পচা বাংলা বলি এবং শুনলে অনেকেরই নাকি লজ্জা হয়।
কিন্তু কেন জানি না, সেই ছোটবেলা থেকেই জেদ চেপেছিল মনে, যে যা বলুক, আমি আমার মতো করেই কথা বলব। আমি অনেক সময় লক্ষ করেছি, একটি পরিবার যখন একত্র হয়, দিব্যি সবাই তাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। কিন্তু পরিবারের বাইরে বা নতুন পরিবেশে কথা বলতেই তাদের ভাষার পরিবর্তন দেখা যায়। এক এলাকার ভাষা অন্য এলাকার মানুষের বুঝতে অসুবিধা হয় বলেই মান ভাষার দরকার আছে।
তবে বিদেশে আসার পর যখন এ দেশের উপভাষার (dialect) সঙ্গে পরিচিত হই, তখন অনুভূতিটা আরও বেশি বেড়ে যায় নিজ দেশের আঞ্চলিক ভাষার ওপর।
তবে সুইডেনে বুন্ডি বলে সরাসরি কোনো শব্দ নেই। যদি সত্যিই কাউকে বুন্ডি বলতে শখ হয়, তবে ‘লিল্লা ছোতা ব্লোম্মা (lilla söta blomma) বলা যেতে পারে। এটা নির্ভর করে বয়স ও পরিস্থিতির ওপর। ভালো কথা সব সময় এবং সবাইকেই বলা সম্ভব।
সুইডেনে এরা সবাই একভাবেই লেখে, কিন্তু কথা বলার সময় সবাই তাদের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে। এখানে এরা এদের আঞ্চলিকতায় পরিচিত হয় যেমন বাংলাদেশে সিলেটি, ঢাকাইয়া; সুইডেনে তেমনি স্টকহোলমারে (Stockholmare), স্কোনিং (Skåning) ওস্টইয়োটারে (Östgötare) ইত্যাদি।
জানি না, ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এর কোনো মিল আছে কি না। তবে আমার ভালোই লাগে আমার মতো করে গ্রামের ভাষায় কথা বলতে। গত বছর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় আমার বোন জলিদের বাড়িতে হঠাৎ হাজির হয়েছিলাম। কয়েক দিন যেতেই তার বাড়িতে ‘বেবি শাওয়ার পার্টি’র ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১০ জন সেই পার্টিতে যোগদান করেছে।
সবাই তাদের বাড়ি থেকে কিছু না কিছু রান্না করে এনেছে। মজার ব্যাপার হলো, ১০ জনের মধ্যে দুজন ছাড়া বাকি সবাই প্রথমবারের মতো মা হতে চলেছে। জলির উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি লস অ্যাঞ্জেলেসের উডহিলে অনুষ্ঠিত হয়।
১০ জন মেয়েই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দূর পরবাস আমেরিকায় বসবাস করছে এবং এদের সবাই পেশায় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। যাই হোক, তাদের খাবারের টেবিলে সবাই যখন বেশ মজার সঙ্গে খেতে মগ্ন, ঠিক তখন আমি একটু ভিডিও করতে শুরু করলাম।
পুরো বেবি শাওয়ার পার্টির বিষয়টি বেশ চমৎকার মনে হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে কয়েকবারই আমি ‘বুন্ডি’ শব্দটি ব্যবহার করি। কারণ, তারা সবাই আমার ছোট বোনের বান্ধবী, তাই এমনিতেই সম্বোধনটা উঠে এল জিহ্বার ডগায়। এখন ‘বুন্ডি’ শব্দটি মনে হলো তাদের কারও কাছে পরিচিত নয়।
তারা আমার বোন জলিকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, ‘বুন্ডি’ বলতে ভাইয়া কী মিন করছেন?’ জলি তখন তাদের ব্যাখ্যা করে বোঝাল, আমাদের গ্রামে ছোট বোনকে বুন্ডি বলে। সবাই হাসল ঠিকই, তবে শব্দটির মধ্যে যে একটি ভালোবাসার ছোঁয়া রয়েছে, তা উপলব্ধি করতে পারল।
আমাকেও বেশ আপ্লুত করেছিল তাদের হৃদ্যতা। যাই হোক, আমি এই শব্দ সচরাচর ব্যবহার করে থাকি সুইডেনেও। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করে, ‘বুন্ডি’ মানে কী আর কেনই-বা বুন্ডি বলি। সুইডেনের বুন্ডিদের খবরাখবর জানতে হলে গ্রীষ্মে আসতে হবে এখানে।
জানার যেমন শেষ নেই, দেখারও শেষ নেই। তেমনি শেষ নেই নতুন কিছু শেখার। সবাইকে এটাই বলতে চাই, তা হলো ধরে রাখুন গ্রামের ভাষাকে। কারণ, ছোটবেলার ভাষাই প্রকৃত মাতৃভাষা, যা দেশকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখায়।
আমার বাবা-মা মারা গেছেন। কেউ আর আদর করে বলবে না ‘বাবা তুই কবে আসবি বাড়িতে’। গতকাল গ্রাম থেকে একটি ছেলে হঠাৎ ফোন করেছে। ফোন ধরে হ্যালো বলতেই বলে, ‘ভাইডি, তুই কেমন আছিস?’
আমি বললাম, ‘ভালো, তা তুমি কে চিনতে পারলাম না তো!’
বলল, ‘ভাইডি রে, আমি তোর পতিতদা।’
শুনেছি, পতিতদা নাকি আমাদের জমিজমা দেখাশোনা করেন। তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড়, বহু বছর তাঁর সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। হঠাৎ তাঁর কথা শুনে ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে গেল, ‘...ওরে মুখ-পোড়া ওরে রে বাঁদর।’ —গালি-ভরা মায়ের অমনি আদর, কত দিন আমি শুনি নারে ভাই...।’