ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। কবে এই যুদ্ধ শেষ হবে, সেই প্রশ্ন অনেকেরই। কোনো যুদ্ধের পেছনে যদি ধর্মীয় মতাদর্শগত কারণ থাকে, তবে তা শেষ হতে সময় লাগে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটি শুধুই ভূ-রাজনৈতিক নাকি এর সঙ্গে কোনো ধর্মীয় মতাদর্শগত বিষয়ও আছে? যদি থেকে থাকে এবং এর গভীরতা যদি খুব বেশি হয়, তাহলে এই যুদ্ধ শেষ হতে সময় লাগবে।
যদিও এ বিষয়টি খুব কমই আলোচনায় এসেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস গত বছরের অক্টোবরে দাবি করেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ শুরু করেছেন। আসলেই কি তাই?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ফিরে যেতে হবে প্রায় ৫০০ বছর আগের জার্মানিতে। যেখানে মার্টিন লুথার নামে এক ধর্মসংস্কারক ১৫১৭ সালে রোমান ক্যাথলিক পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এ জন্য তাঁর বিচার হয়েছিল এবং জেলেও যেতে হয়েছিল। তখন মার্টিন লুথারের অনুসারীরা ক্যাথলিকদের থেকে আলাদা হয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট হিসেবে একটি নতুন ধর্মমতের উত্থান ঘটালেন। তাঁর সেই ধর্মসংস্কার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি একাধিকবার রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধেও জড়িয়েছে। এর মধ্যে একটি যুদ্ধ ৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। তবে এসব যুদ্ধের পরও প্রোটেস্ট্যান্টদের স্বাধীনতার মতবাদের সামনে কর্তৃত্বপরায়ণ রোমান ক্যাথলিকদের ক্ষমতার কাঠামো ক্রমেই দুর্বল হয়েছে।
প্রোটেস্ট্যান্টরা গির্জাগুলোতে নারীদের ধর্মযাজক হিসেবে অনুমোদন দিয়ে নারী স্বাধীনতায় বিপ্লব ঘটালেও গোঁড়া ক্যাথলিক এবং অর্থোডক্স মতবাদ সেটা কখনো মেনে নেয়নি। বর্তমানে ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ রাজনৈতিকভাবে মার্টিন লুথারের স্বাধীনতার ধারণাকেই গ্রহণ করেছে। তাঁর এই স্বাধীনতার ধারণা আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশ ও সমাজের মূল ভিত্তি। এই স্বাধীনতার ধারণাটিকে যেসব দেশ ও জাতি গ্রহণ করতে পারেনি, তারা খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত হলেও সেখানে গণতন্ত্রের বিকাশ হয়নি। যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতন্ত্র, নারীবিদ্বেষ থাকে, সেখানে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো টেকসই ও কার্যকর হয় না; বরং স্বৈরাচার ফুলেফেঁপে ওঠে। যে কারণে প্রায় ৯৯ ভাগ শিক্ষিত হওয়ার পরও গোঁড়া অর্থোডক্স সংখ্যাগরিষ্ঠ রাশিয়ায় কখনোই গণতন্ত্রের বিকাশ হয়নি। আর পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ানদের মানসিক দূরত্ব থেকেই গেছে।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের আগপর্যন্ত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত মিত্র ছিল রাশিয়া। তাহলে কেন এই যুদ্ধ? ইউক্রেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থোডক্সীয় খ্রিষ্টান হওয়ার পরও রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা স্বাধীনতার মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ায় গোঁড়া রুশ অর্থোডক্সীয় ধর্মনেতা ও পুতিনপন্থী রাজনীতিবিদেরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। সাধারণত স্বৈরাচারেরা যখন দুর্বল হয়ে ওঠে, তখন তারা দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী বা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়। করোনাসহ অন্যান্য কারণে পুতিন ও তাঁর অভিজাতদের ক্ষমতার কাঠামো নড়বড়ে হয়ে ওঠায় রুশ জনগণের অসন্তোষ ও দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করেন পুতিন ও তাঁর অনুগামীরা।
অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে জনগণের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মানসিকতার ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মূলত গোঁড়া খ্রিষ্টান মতবাদের অনুসারীরা বাইবেলের আদি নিয়ম বা নবীদের শিক্ষাকে অনুসরণ করে যুদ্ধকে ধর্মীয়ভাবে বৈধতা দেন। কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মের প্রবর্তক জিসাস ক্রাইস্টের শিক্ষায় কোনো যুদ্ধ নেই—পশ্চিমা সমাজে ক্রমেই এই মতবাদের বিস্তার ঘটছে এবং জনপ্রিয় হচ্ছে। আর এ কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহু ভাষাভাষী দেশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একই প্ল্যাটফর্মে আসতে পেরেছে। কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে রুশ সমাজে এখনো যুদ্ধবিরোধী মানসিকতার বিকাশ ঘটেনি। রাশিয়ায় একের পর এক স্বৈরতন্ত্রের যে উত্থান হয়েছে, সেটি তাদের জনগণের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রতিফলন। এ কারণেই গত শতাব্দীর শুরুর দিকে গোঁড়া অর্থোডক্সদের মধ্যে কার্ল মার্ক্সের নাস্তিকতাবাদী স্বৈরাচারের বিস্তার ঘটেছিল। তবে পশ্চিমা স্বাধীনতার মতবাদের কাছে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেই নিজের পতন ঘটিয়েছে। এরপর রুশ সমাজে কিছুটা ধর্মীয় সংস্কার আসতে শুরু করেছে। স্বাধীনতার এই আকাঙ্ক্ষা যতই জোরালো হবে, স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পথে রুশরা ততই অগ্রসর হবে। সেই সঙ্গে এই ভূ-রাজনৈতিক ও আদর্শিক ধর্মযুদ্ধেরও অবসান ঘটবে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটি ৫০০ বছর আগে শুরু হওয়া ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট বিরোধের পরিণতির দিকেই এগোচ্ছে। ইতিহাস বলছে, এই যুদ্ধ শেষ হতে হয়তো সময় লাগবে এবং ইতিহাস এ-ও বলছে, রাশিয়া নিশ্চিত পরাজয়ের দিকেই এগোচ্ছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, পশ্চিমাদের স্বাধীনতার মতবাদের কাছে রাশিয়া আবারও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাজিত হতে যাচ্ছে।
মান্দি ডি কস্তা, সাংবাদিক ও গবেষক