হোম > ছাপা সংস্করণ

রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে কমিউনিস্ট পার্টি

ড. এম আবদুল আলীম

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদের ওপর মুসলিম লীগ সরকার কঠোর দমন-পীড়ন চালালেও এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের প্রভাবে বিশ্বের দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে ওঠে।

পরাধীন ভারতেও এর ঢেউ এসে পৌঁছায়। ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর (তাসখন্দ শহরে) প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নবগঠিত পাকিস্তানে স্লোগান তোলা হয়, ‘ইয়ে আজাদি ঝুট হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়, সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলে এই সরকার হটাও।’ মোট কথা ‘ভুয়া স্বাধীনতা’র বিরুদ্ধে ধর্মঘট, জঙ্গি মিছিল, সভা ও সশস্ত্র সংগ্রাম প্রভৃতির আহ্বান জানানো হয়। দলের এই ‘বাম-হঠকারী লাইন’ গ্রহণ করায় পাকিস্তান সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। পরে বাস্তবতা বিবেচনা করে দল পরিচালনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কমিটিতে রদবদল আনা হয়। ‘বাম-হঠকারী লাইন’ পরিত্যাগ করে সুস্থিরভাবে দল পরিচালনার জন্য ১৯৫১ সালে মণি সিংহকে সাধারণ সম্পাদক; বারীণ দত্ত, নেপাল নাগ, সুখেন্দু দস্তিদার ও খোকা রায়কে সম্পাদকমণ্ডলী এবং শেখ রওশন আলী, শহীদুল্লা কায়সার ও শচীন বোসকে সদস্য করে ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’র নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

পাকিস্তান সরকারের দমন-পীড়নে ভাষা আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা অবস্থার মধ্যেও বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রত্যক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ‘সকল ভাষার সমান অধিকারের’ প্রশ্নে অটল থাকেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘটকে পাকিস্তান সরকার এবং তাদের দোসররা কমিউনিস্টদের ‘উসকানি’ বলে অভিহিত করে। ১৯৪৮ সালের ১২ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘ধর্মঘটের পশ্চাতে কমিউনিস্টদের উস্কানি’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১২ মার্চ মুসলিম লীগের গুন্ডারা পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কাপ্তান বাজার ও কোর্ট হাউস স্ট্রিটের অফিসে আক্রমণ চালায় এবং জিনিসপত্র তছনছ করে। ১৩ মার্চ রণেশ দাশগুপ্ত এবং ধরণী রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়।

শহীদুল্লা কায়সার কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ছাত্র আন্দোলনে পার্টির কর্মীদের নির্দেশ প্রদান ও পরিচালনা করতেন। এ ছাড়া বাম রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মুনীর চৌধুরী, কল্যাণ দাশগুপ্ত, নাদেরা বেগম, তাজউদ্দীন আহমদ, আখলাকুর রহমান ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন।

কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুস সামাদ প্রমুখকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত’ মেনে ভাষা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিল পার্টি। তাঁরা সে অনুযায়ী ভূমিকা পালন করেছেন।

কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকার নেতারা অনেক ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেও ঢাকার বাইরের নেতা-কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ছাত্র এবং যুবকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের সংগঠিত করে ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ ভাষা আন্দোলন বেগবান করেছে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টনের জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করলে চারদিকে প্রতিবাদ শুরু হয় এবং ভাষা আন্দোলন প্রবল রূপ ধারণ করে। এমন পরিস্থিতিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়, যাতে বলা হয়: ‘লীগ সরকার উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে চালু করার চেষ্টা করিয়া বাঙালির অধিকার ও কৃষ্টির উপরই আক্রমণ করিতেছেন। ইহাতে পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নতি ব্যাহত হইবে। তাই “বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা ও সকল ভাষার সমমর্যাদা দান” পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষী ব্যক্তির দাবি। এই দাবির পিছনে বাঙালি-অবাঙালি সকল জনসাধারণকে সমবেত হওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাইতেছি।’

১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভাঙার বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশনা ছিল না। এ জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি নবাবপুরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে আয়োজিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভায় এই পার্টির প্রতিনিধি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে কথা বললেও ভোটদানে বিরত থাকেন।

পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে না থাকলেও এই দলের নেতা-কর্মীদের অনেকেই সেই নির্দেশ মানেননি। মোহাম্মদ তোয়াহা, মোহাম্মদ সুলতান, গাজীউল হক প্রমুখ ‘সেদিন কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশ অগ্রাহ্য করেছেন’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার ছাত্রসমাবেশের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলে অংশ নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে আত্মগোপনে থাকা আত্মবিশ্বাসে দুর্বল কমিউনিস্ট পার্টি ব্যাপক ছাত্র-জনতার শক্তির সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেনি। নেতারা ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা ও জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি আঁচ করতে পারেননি। কমিউনিস্ট পার্টি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে’র সঙ্গে ঐকমত্যে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছে। এ পার্টি কেবল ছাত্রদের ওপর ভরসা না করে ভাষা আন্দোলনকে ‘জনগণের সামগ্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করতে’ চেয়েছিল। তাই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারা ১৪৪ ধারা না ভঙ্গের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সে অনুযায়ী আন্দোলন পরিচালনার জন্য পার্টির সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য যখন বদ্ধপরিকর হলেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সে অনুযায়ী একের পর এক পদক্ষেপগুলো নিতে শুরু করলেন, তখন কমিউনিস্ট পার্টিও তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনে সর্বতোভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছিল।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব কতটুকু ছিল, তা আঁচ করা যায় পাকিস্তান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, আমলা, সরকারের তল্পিবাহক রাজনীতিবিদদের বক্তব্য এবং সরকার-সমর্থক পত্র-পত্রিকার সংবাদ থেকে। স্বয়ং নূরুল আমীন এই আন্দোলনকে কমিউনিস্টদের কারসাজি বলে বিবৃতি দেন। পত্র-পত্রিকাগুলোও কম যায় না। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘট সম্পর্কে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় বলা হয়: ‘সমস্ত আন্দোলনটী ঢাকার কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছাত্র ফেডারেশনের চক্রান্তের ফল।...পুলিশ যাহাদের গ্রেফতার করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে ঢাকা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি দেবপ্রসাদ মুখার্জ্জি, ছাত্র ফেডারেশনের কমল বসু এবং নীহার দত্ত মজুমদার অন্যতম।’ ১৯৫২ সালের ৩ মার্চ পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন বেতার ভাষণে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়নের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে সব দায় কমিউনিস্টের ওপর চাপিয়ে দেন।

তিনি বলেন: ‘রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য কতিপয় কমিউনিস্ট ও অন্য সব বিদেশি দালাল এবং অসন্তুষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে গভীর ষড়যন্ত্র চলিতেছিল, সরকারি ব্যবস্থার ফলে তাহা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হইয়াছে।’

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক তুলেছেন। ১৯৯০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশ পত্রিকায় এম আর আখতার মুকুল ‘শহীদ মিনারের ইতিকথা’ শীর্ষক লেখায় ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। এর জবাবে সুধীন রায় দেশ পত্রিকায় কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার পক্ষে পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন। অন্যদিকে তমদ্দুন মজলিসের প্রধান নেতা প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম এবং প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র আহ্বায়ক এস এম নূরুল হক ভূঁইয়া ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির অবদানকে অস্বীকার করে ‘আমার জানামতে কম্যুনিস্ট পার্টির কোন নেতা ১৯৪৭-৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছিলেন না।’ কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এবং এর যুব ও ছাত্রফ্রন্টের কর্মীদের অবদানের ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে এই দলের নেতা-কর্মীরা জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে দিন কাটিয়েছেন।

লেখখ: ড. এম আবদুল আলীম অধ্যাপক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে

সন্দ্বীপ সুরক্ষা প্রকল্প: এক বছরেও শুরু হয়নি কাজ