চোরাচালানের অভিযোগে ১৯৮৯ সালে যশোরের শার্শা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা মামলায় স্থানীয় তিন আসামির সাজা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ২২ মার্চ। ওই মামলায় কারাগারে থাকা আসামি শহীদ প্রধানীয়া হাইকোর্টে আপিল করেন। তাতে জামিন চাওয়ার পাশাপাশি মামলার কার্যক্রম বাতিল চাওয়া হয়। শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সাজা কেন বাতিল করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই বছরের ৫ জুন আসামি শহীদকে জামিন দেন আদালত। সেই থেকে মামলার কার্যক্রম নথিবন্দী অবস্থায় আছে।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা যায়, উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৯৯৬ সাল থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৮ বছরে স্থগিত আছে মোট ৭৪ হাজার ৫৪৪টি মামলার বিচারকাজ। এর মধ্যে ২৮ বছর ধরে স্থগিত হয়ে আছে ১১টি মামলার বিচার। একইভাবে ১৯৯৭ সাল থেকে অর্থাৎ ২৭ বছর ধরে ৬০টি, ২৬ বছর ধরে ১৮৮টি, ২৫ বছর ধরে ৩৮৭টি, ২৪ বছর ধরে ৩৮৬টি, ২০ বছর ধরে ৩ হাজার ৬৯০টি এবং ১০ বছর ধরে ৪০ হাজার ৯০১টি মামলার বিচারকাজ স্থগিত হয়ে আছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ মনে করেন, ২৮ বছর আগের মামলা এখনো উচ্চ আদালতে অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকাটা দুঃখজনক।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনার দিনই (৮ অক্টোবর) বলেছিলাম পুরোনো মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার জন্য।’ তিনি বলেন, ফৌজদারি এখতিয়ারসম্পন্ন সব বেঞ্চকে দায়িত্ব দিতে হবে, যাতে সপ্তাহে অন্তত এক দিন শুধু এসব মামলার শুনানি করেন। তা না হলে এসব কখনোই শেষ হবে না।
অবৈধ অস্ত্র ও গুলি নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার ১৯৯১ সালের এক মামলায় ২০০০ সালের ২৩ এপ্রিল বিচারিক আদালত আসামি রফিককে ১২ বছরের সাজা দিয়েছিলেন। কারাগারে থেকে রফিক ওই বছরের ৭ জুন হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন। আবেদনে মামলা বাতিল চাওয়া হয়। একই বছরের ২৫ জুন রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পরে কয়েক দফা কার্যতালিকায় এলেও নিম্ন আদালতের নথি না আসায় শুনানি হয়নি। এর পর থেকে এভাবেই পড়ে আছে মামলাটি।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল গোলাম রব্বানী আজকের পত্রিকাকে বলেন, পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির বিশেষ নির্দেশনা আছে। যেসব বেঞ্চের এসব মামলা শুনানির এখতিয়ার দেওয়া আছে, সেসব বেঞ্চে মামলাগুলো ভাগ করে দেওয়া হবে নিষ্পত্তির জন্য।
ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ বলেন, এসব স্থগিত মামলা শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিতে পারেন। এ ছাড়া যেসব বেঞ্চে এসব মামলা শুনানি হয়, সেখানে পুরোনো মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য সপ্তাহে এক-দুই দিন দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
নিম্ন আদালতের যেকোনো পর্যায়ে আসামিপক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ ক ধারায় মামলার কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করে তা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা যায়। রায়ের পরও অনেকে এ রকম আবেদন করেন। তবে সেই সংখ্যা খুব বেশি নয়। সে ক্ষেত্রে আসামিকে দেখাতে হয় মামলা দায়ের, অভিযোগ গঠন থেকে শুরু করে রায় পর্যন্ত কোনো কিছুই যথাযথভাবে হয়নি। ৫৬১ ক ধারায় করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম এবং কিছু ক্ষেত্রে রায় স্থগিত করে থাকেন।
ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ ফারুক বলেন, ‘আসামিপক্ষ মামলা আটকে রাখে। কারণ, তারা সুবিধাভোগী। ফৌজদারি মামলায়ও দুটি পক্ষ থাকে। এখানে কাউকে না কাউকে তৎপর হতেই হবে। অবশ্যই এটি রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব। তারা এর দায় এড়াতে পারে না। আর সবার সম্মিলিত চেষ্টা না থাকলে কোনো দিনও এ জায়গা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।’