হোম > ছাপা সংস্করণ

সরকারের আশ্বাস প্রতিপালিত হবে কি?

এ কে এম শামসুদ্দিন

আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন আমাদের একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন, যাঁকে আমরা যমের মতো ভয় পেতাম। নাম সিদ্ধেশ্বর হালদার। ভীষণ রাগী কিন্তু বিদ্বান ও পণ্ডিত ছিলেন। তিনি আমাদের অঙ্কের ক্লাস নিতেন। ক্লাসে মনোযোগী না হলে প্রচণ্ড রেগে যেতেন। স্যারের অঙ্কের পাণ্ডিত্য দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। তাঁর একটি বিশেষ গুণ ছিল। সমাজে নিজেদের ভালোভাবে গড়ে তোলার জন্য তিনি প্রতিদিন অঙ্ক করানো শেষে একটি করে উপদেশ দিতেন। তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। কদিন বাদেই এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা। সিদ্ধেশ্বর স্যারের শেষ ক্লাস। তিনি সবার উদ্দেশে বললেন, ‘তোদের সঙ্গে আজই আমার শেষ ক্লাস। তোরা স্কুলজীবন শেষ করে কলেজে যাবি, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন নতুন পেশায় জড়িয়ে পড়বি। একটা কথা মনে রাখিস, নিজ থেকে কেউ কাউকে সম্মান দেয় না। নিজের কাজ ও ভালো আচার-আচরণের বিনিময়ে সম্মান অর্জন করতে হয়। আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিরাই সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকেন। যিনি নিজেকে সম্মান করতে জানেন না, তিনি অন্যের সম্মানও আশা করতে পারেন না। একজন মানুষের আত্মসম্মানবোধ বড় অমূল্য সম্পদ। এই আত্মসম্মান সারা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি হয়। অভিজ্ঞতা যদি ভালো হয়, তাহলে উচ্চ আত্মসম্মানবোধ তৈরি হবে। আর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে তার বিপরীত হবে।’

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল যেদিন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন সেই সিদ্ধেশ্বর হালদার স্যারের কথাই মনে পড়ছিল আমার। জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙাতে গিয়ে তাঁদের জীবনহানির আশঙ্কা নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন। সরকারের উঁচু মহলের বিশেষ অনুরোধে তিনি সস্ত্রীক গিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে। পিতাসম দায়িত্ব নিয়ে তাঁদের বুঝিয়ে অনশন ভাঙাতে রাজি করিয়েছেন। জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী গোটা জাতি, বিশেষ করে বর্তমান সরকারকে আশঙ্কামুক্ত করেছেন। এ কাজটি করে তাঁরা অকৃত্রিম মহানুভবতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এই শিক্ষক দম্পতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক আগেই; কিন্তু তাঁরা এখনো শিক্ষার্থীদের কাছে সমভাবে জনপ্রিয় ও আস্থার জায়গা। যে কাজটি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির অনেক আগেই করা উচিত ছিল, সে কাজটিই অধ্যাপক জাফর ইকবাল করে দেখিয়েছেন।

আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করেছি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে শিক্ষামন্ত্রী ঢাকায় বসে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। তিনি টেলিফোনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললেও তাঁদের কাছে যাননি। ৭১ টিভির একটি টক শোর আলোচক জ ই মামুন সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে কেন গেলেন না—জিজ্ঞেস করতে দীপু মনি বলেছিলেন, ‘দেখেন, সবকিছুর একটা সময় আছে। সঠিক সময়, সঠিক কাজটি করতে হয়। অর্থাৎ “রাইট টাইম”। এখন ড. জাফর অনশন ভাঙিয়েছেন, আমি টেলিফোনে ওনাদের উপস্থিতিতেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি।’

জাফর ইকবাল অনশন ভাঙানোর পরপর সাংবাদিকদের বলেছেন, উচ্চপর্যায়ের কিছু ব্যক্তির অনুরোধে একটি শর্তে এই কাজে রাজি হয়েছেন যে শিক্ষার্থীদের সব দাবি সরকার মেনে নেবে। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন, উপাচার্যের অপসারণের দাবি যদি সরকার না মানে, তখন আপনার কী অবস্থান হবে? উত্তরে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু প্রশাসন আন্দোলনকে ভণ্ডুল করতে যেসব পথ বেছে নিয়েছে, তা অমানবিক, নিষ্ঠুর ও দানবীয়। আর এই শিক্ষার্থীদের দাবি সরকার যদি না মানে, সেটা হবে তাঁর এবং দেশের প্রগতিশীল মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে অনশন ভাঙলেও উপাচার্যের অপসারণের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত ২৬ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা অনশন ভেঙেছে। তারপর বেশ কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও উপাচার্যের পদত্যাগ অথবা অপসারণের কোনো উদ্যোগ সরকার নিয়েছে কি না, জানা যায়নি। যদিও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রতিদান দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এই আশ্বাসের ওপর কতটুকু ভরসা করা যায়, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় আছে। অতীতে শিক্ষার্থীদের এমন অনেক আন্দোলনের মুখে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা মানেনি। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির অনেক কিছুই পরিবহন মালিকদের চাপে আজও রক্ষা করা হয়নি।

অতীতে দেখা গেছে, আন্দোলন তীব্র হলে আইন প্রয়োগকারী সদস্যদের সঙ্গে হেলমেট পার্টি, হাতুড়ি পার্টি লেলিয়ে দিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শত শত বেনামি মামলা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুন্নেসা হলের প্রাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রাধ্যক্ষদের পদত্যাগ এবং ছাত্রীবান্ধব, দায়িত্বশীল প্রাধ্যক্ষ কমিটি নিয়োগের দাবিতে ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা শিক্ষকদের সামনেই অতর্কিত হামলা চালায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা যখন উপাচার্যকে ঘেরাও করেন, তখন যে পুলিশি আক্রমণ হয়েছিল, তা ছিল আরও ভয়াবহ। দেশবাসী আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছে, পুলিশি অ্যাকশনের পর শিক্ষার্থীরা যখন উপাচার্যের পদত্যাগের একদফা দাবিতে চলে গেল, তখন সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোঝানোর জন্য সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সেখানে পাঠাল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা কী? তাঁরা কোন প্রটোকলে সেখানে গিয়েছিলেন? তাঁরা কি সেই অধিকার রাখেন? বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে দেশের যেকোনো সমস্যা সমাধানে স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা নাক গলানোর অধিকার রাখেন!

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনায় সরকার আরও একটি বেঠিক কাজ করেছে। তা হলো, আন্দোলনরত ছাত্রদের অর্থ সাহায্য করার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পাঁচ ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে। ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনকারীদের অর্থ সাহায্য করলে অপরাধ হয়, এটা বাংলাদেশের কোন আইনে লেখা আছে? ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময়ও। তখন মিরপুর-১৪ এলাকায় মধ্যবয়সী একজন ভদ্রমহিলা আন্দোলনকারী ক্ষুধার্ত শিক্ষার্থীদের খাবার খাইয়েছিলেন। তাঁর সেই খাওয়ানোর দৃশ্য মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে তা ভাইরাল হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খাওয়ানোর অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। ভদ্রমহিলার থানা-পুলিশের হয়রানির সংবাদও তখন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল।

সমাজে একটি কথা প্রচলন আছে, ক্ষমতাসীনেরা বিরোধী দলকে যত না ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভয় পায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে। মামলা-হামলার ভয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ঘরমুখো হয়ে পড়ায় সরকার বেশ স্বস্তিতেই আছে বলে মনে হয়। তারা জানে রাজনৈতিক আন্দোলনে সব স্তরের মানুষ শরিক না-ও হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে সমাজের সবারই একটা নৈতিক সমর্থন থাকে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের যেকোনো আন্দোলন দানা বাঁধলে সরকারকে বেশ উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়। এসব আন্দোলনকে তখন রাজনৈতিক রং দেওয়ার অপচেষ্টাও চলে; যাতে সাধারণ মানুষ আন্দোলনকারীদের ভুল বোঝে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে বাইরের ইন্ধন আছে বলে রং লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রী মিডিয়ায় দেওয়া বক্তব্যে এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। সরকারের ভিত শক্ত হলে এসব আন্দোলনে উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়। আমলা, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গণতান্ত্রিক সরকারের শক্ত ভিত হতে পারে না। দেশের জনগণই হলো একটি দেশের সবচেয়ে শক্ত ভিত। বর্তমার সরকার নিজেদের জনসমর্থিত বলে দাবি করে থাকে। তাই ছাত্রদের কোনো ন্যায়সংগত দাবিতে সরকারের বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।

এখন সবাই অপেক্ষা করছেন জাফর ইকবালের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেওয়া আশ্বাস সরকার রক্ষা করে কি না। কোনো ছলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া ঠিক হবে না। সরকার যদি মনে করে অনশন ভাঙার পর উপাচার্যের অপসারণের দাবি থেকে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে সরে যাবেন, তাহলে ভুল করবেন। ‘ছাইচাপা দেওয়া আগুন’ নিয়ে নাড়াচাড়া না করাই ভালো। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত উপাচার্যকে অপসারণ করাই উত্তম হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিলে সরকারের পরাজয় হবে—এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই; বরং উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে সরিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করে অন্যান্য উপাচার্যকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সরকারের জন্যই ভালো হবে। এর ফলে তাঁরা নিজেদের কোনো অনিয়ম ও গাফিলতি থাকলে সংশোধনের আগাম সুযোগ পাবেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস

হইহুল্লোড় থেমে গেল আর্তচিৎকারে

সন্দ্বীপ সুরক্ষা প্রকল্প: এক বছরেও শুরু হয়নি কাজ