উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শিশুরাও আন্দোলিত হয়েছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে খতম করার চেষ্টা করেছিলেন আইয়ুব খান। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সমাধির পাশাপাশি শারীরিকভাবেও তাঁকে সমাধিস্থ করে তোলার ষড়যন্ত্র পাকিয়েছিল সরকার। সেই গণজোয়ার থামিয়ে দিতে মিছিলে গুলি চালিয়েছে পাকিস্তানিরা। শহীদ হয়েছেন আসাদ, মতিউর।
১৯৬৬ সালের মে মাস থেকে কারাবন্দী শেখ মুজিবকে একসময় জেলগেটে ছেড়ে দিয়ে সেখানেই গ্রেপ্তার করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয়। আন্দোলনের তোড়েই শেখ মুজিব মুক্ত হয়েছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং আইয়ুবশাহির পতনের পর ইয়াহিয়া খান যে নির্বাচন দিলেন, সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবের পেছনেই দাঁড়াল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ।
শিশুদের কীভাবে আন্দোলিত করেছিল উনসত্তর, সে কথাই বলছি। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করেছিল সামরিক বাহিনী। সেই ঘাতকদের বিচারের দাবিতে অবিরাম ধর্মঘট করছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষক।
জুন মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তাজউদ্দীন আহমদ এলেন আনিসুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে। বঙ্গবন্ধু চলে যাওয়ার আগে আনিসুজ্জামানের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে রুচি এসে বাবার কানে কানে বলল, ‘আসাদ আসেনি?’
গণ-অভ্যুত্থানের সময় পাড়ায় পাড়ায় যে দুটি স্লোগান শোনা যেত সেগুলো হলো, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। ‘আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’।
তাই পাঁচ বছরের একটি শিশুর কাছে মুজিব ও আসাদ ছিল খুব কাছের মানুষ। শেখ মুজিব এসেছেন শুনে রুচির সরল প্রশ্ন, ‘আসাদ আসেনি?’ বঙ্গবন্ধু রুচিকে আনিসুজ্জামানের সঙ্গে কানে কানে কথা বলতে দেখে বললেন, ‘ও কী বলছে?’
রুচির প্রশ্নটি শুনে বিশালদেহী মানুষটা নিচু হয়ে রুচির গাল ধরে বললেন, ‘ওরা আমাদের কাছে এর কৈফিয়ত চাইতেই পারে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বঙ্গবন্ধুর বুক থেকে। রুচির মাথায় হাত দিয়ে তিনি বিদায় নিলেন।
সূত্র: আনিসুজ্জামান, আমার একাত্তর, পৃষ্ঠা ১০-১৪