শিরোনামে বলা হলো ‘গল্প’, কিন্তু আসলে আমরা বলতে চাইছি ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পার হলো, আমরা দেখতে পেলাম, আমাদের অর্জনের কতটুকুই বা আমরা জানি। জনযুদ্ধের এই সুবিশাল ইতিহাসকে খণ্ডিত আকারে উপস্থাপন করলে আমাদের এই বিশাল ঐতিহাসিক মহাকাব্যটিকে অবমূল্যায়ন করা হয়।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ডাকরা ডিগ্রি কলেজের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনালেন চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সে খবরটি দেখেই মনে হলো, মুক্তিযুদ্ধের মৌখিক ইতিহাস নিয়ে কাজ খুব একটা এগোয়নি আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের পর অনেকেই যুদ্ধাবস্থা নিয়ে বই লিখেছেন। বিচিত্র সেই গ্রন্থসাম্রাজ্যে হয়তো মনের মতো কোনো বইও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কখন কীভাবে এই যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হলেন, তা যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের বড় কোনো প্রকল্প নেওয়া হতো, তাহলে একটা বড় কাজ হতো। বিচ্ছিন্নভাবে এ কাজটা একেবারে হয়নি, তা নয়; কিন্তু তাতে সামগ্রিক অবয়ব ফুটে ওঠেনি।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। সে পথেই এই ভূখণ্ডে জন্মেছিল দুটি দেশ—ভারত আর পাকিস্তান। সেই পাকিস্তানের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ, এই ইতিহাসটুকু মনে রাখা খুব দরকার। এত ধরনের মতবাদ থাকতে সে সময় কেন দেশবাসী বাঙালি জাতীয়তাবাদে দীক্ষিত হলো, তার কারণ হয়তো ইতিহাসবিদেরা যুক্তি-তর্ক দিয়ে উপস্থাপন করতে পারবেন, কিন্তু মূলত প্রতিটি একক ব্যক্তির কাছে প্রশ্ন রাখলে যে কারণগুলো বেরিয়ে আসত, সেগুলোই হয়ে উঠতে পারত দামি রত্ন। ডাকরা ডিগ্রি কলেজে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গিয়ে যখন মুক্তিযোদ্ধারা কাঁদছিলেন, তখন বোঝা যাচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধ বয়ে গেছে তাঁদের প্রাণের ওপর দিয়ে। সেই প্রাণের স্রোতে এখনো অবগাহন করেন তাঁরা।
সময় বয়ে গেছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা গতায়ু হয়েছেন। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের বয়সও এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন স্মৃতিশক্তি তাঁদের প্রতারিত করতে পারে। যাঁরা এখনো সুস্থ মস্তিষ্কে যুদ্ধকালের বর্ণনা দিতে পারবেন, তাঁদের কাছ থেকে সরকারি-বেসরকারিভাবে ইতিহাসটা শুনে রাখা দরকার।
ডাকরায় যখন মুক্তিযোদ্ধারা বলছিলেন, ভাতের থালা হাতে খেতে বসা মুক্তিযোদ্ধাকে কীভাবে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে, কিংবা যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধারা এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর কাছ থেকে কীভাবে লুকিয়েছিলেন তাঁর স্বামীর শহীদ হওয়ার সংবাদ, তখন বুঝতে পারা যায়, এক একজন মুক্তিযোদ্ধা কতশত সত্য গল্প বুকে চেপে রেখেছেন। এই গল্পগুলো হয়ে উঠতে পারে আমাদের জীবনের পাঠ। আমরা জানি, জটিল ও সংকটকালের যেকোনো জীবনের গল্পই কাল্পনিক গল্পকে হার মানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক গল্পই আমরা শুনেছি। শুনে শরীরে কাঁটা দিয়েছে। আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া এত বড় একটি যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সেই রোমহর্ষক গল্পগুলো থেকে কোনো অংশেই কম নয়। সেই অমলিন কথা যদি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাওয়া যায়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধকে নিজের প্রাণে জায়গা করে দেবে তারা, মুক্তিযুদ্ধের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ হবে তখন।