একান্নবর্তী পরিবার—বহুব্রীহি সমাস দ্বারা যুক্ত এই শব্দ দুটি কমবেশি সবার কাছে পরিচিত। মূলত পরিবারের প্রসঙ্গেই শব্দটির ব্যবহার দেখি আমরা। কিন্তু এই ‘একান্নবর্তী’ শব্দটির সঙ্গে কি সংখ্যা ‘একান্ন’র কোনো সম্পর্ক আছে? অনেকেই আবার ‘একান্নবর্তী পরিবার’ কথাটি শুনে পরিবারের সদস্যসংখ্যা গণনা শুরু করে দিতে পারেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যসংখ্যা একান্ন হলেই কি একান্নবর্তী পরিবার বলব? তাহলে একান্নবর্তী শব্দের অর্থ কী? আসল কথা হলো এই একান্ন মানে সংখ্যা ৫১ নয়। এখানে এটি সমাস দ্বারা যুক্ত শব্দ। চলে আসি মূল প্রসঙ্গে।
এক+অন্ন=একান্ন [অ+অ=আ হয়েছে (সন্ধির নিয়ম অনুসারে)]
সুতরাং ‘একান্নবর্তী পরিবারে’র অর্থ হলো, এক অন্নে প্রতিপালিত পরিবার, একসঙ্গে আহার করে এমন পরিবার, পরিবারের সদস্যদের খাওয়া-পরা একসঙ্গে করা হয় এমন পরিবার, যৌথ পরিবার; ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি ‘জয়েন্ট ফ্যামিলি’। শব্দটির আর্থক্ষেত্র (সিমেন্টিক ফিল্ড) বিবেচনায় এটি পরিবার শ্রেণিভুক্ত শব্দ; অর্থাৎ পরিবার বা পারিবারিক কোনো প্রসঙ্গে এ শব্দটির ব্যবহার লক্ষণীয়।
একান্নবর্তী পরিবারে দাদু, ঠাকুরমা, কাকা, কাকিমা, জ্যাঠা, জেঠিমা, জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনদের নিয়ে একসঙ্গে জমজমাটভাবে খাওয়া-পরা-থাকা হতো। পরিবারে সবার স্নেহ-ভালোবাসা-শাসনে ছোটরা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠত। এতে করে পরস্পরের মাঝে স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। সবার সুখে-দুঃখে সবাই পাশে থাকে। ফলে পরিবারের প্রতিটি শিশুর মধ্যে শিষ্টাচার ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে শৈশবকাল থেকেই। একসঙ্গে থাকা-খাওয়া, গল্পগুজবে দিন কাটত সাবলীলভাবে। হয়তো সব সময় সবার জন্য দামি দামি জামাকাপড়, অতি-মুখরোচক খাবারদাবার পাওয়া যেত না, হয়তো মাঝে মাঝে সাংসারিক অশান্তি হতো কিন্তু তারপরও একটা নিরেট আনন্দ ছিল যেখানে পারস্পরিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কোনো অভাব ছিল না। বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ ছিল।
অপরদিকে এর বিপরীত শব্দ সম্ভবত প্রাচীন বাংলায়ও পাওয়া যাবে না, কেননা নিউক্লিয়ার পরিবারের ধারণাটি অপেক্ষাকৃত নতুন। তারপরও দৈনন্দিন ব্যবহারে অণু পরিবার, ক্ষুদ্র পরিবার বা দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের ধারণা আমাদের সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত রয়েছে। তবে অঞ্চলভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন নামও প্রচলিত আছে। যেমন ‘ভিন্ন পরিবার’, ‘ভিন্ন হওয়া’, ‘হাঁড়ি আলাদা’ প্রভৃতি।
ঋগ্বেদের বিবাহ সূক্তের (১০ / ৮৫) পাঠ থেকে প্রতীয়মান হয় সেকালে একান্নবর্তী পরিবারের অস্তিত্ব ছিল অধিক পরিমাণে। প্রাসঙ্গিক অংশটিতে আছে বধূকে আশীর্বাদসূচক একটি ঋক্ (৪৬)। এতে যা লিপিবদ্ধ আছে, তার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, ‘তুমি শ্বশুরের ওপর প্রভুত্ব করো, শ্বশ্রূকে বশ করো, ননদ ও দেবরগণের ওপর সম্রাটের মতো আধিপত্য করো।’ বিয়ের পর বধূ এক বিরাট পরিবারের অঙ্গীভূত হতো; তাকে শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, দেবরদের নিয়ে যৌথ সংসার করতে হতো। তাই গুরুজনেরা আশীর্বাদসূচক এই কথাগুলো নববধূকে বলে দিতেন। যেন বিয়ের পর তিনি নতুন একান্নবর্তী সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। সুতরাং একান্নবর্তী পরিবারের ধারণাটি যে বেশ প্রাচীন এবং বহুল চর্চিত, এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।
প্রকৃতপক্ষে একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবার হলো একটি শক্তিপুঞ্জ, যা যাপিত জীবনের বহুবিধ প্রতিকূলতাকে সহজেই জয় করে পরিবারের সব সদস্যকে সম্মিলিত আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে পারে।
লেখক: রাজীব কুমার সাহা, আভিধানিক ও প্রাবন্ধিক