নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সদর ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামের সন্তোষ সরকার নামে এক কৃষকের ২ হাজার ৫০০ চালকুমড়ার গাছ কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মূলত পুরোনো বিরোধের জেরে প্রতিবেশী পাঁচ-ছয়জন মিলে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর আজকের পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি নিয়েই কথা বলা হচ্ছে।
মানুষ কেন এমন হয়? দিনে দিনে কি মানুষের মানবিকতা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে? ‘মনুষ্যত্বের শিক্ষাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমিয় বাণী কি আমরা আত্মস্থ করতে পেরেছি? চারদিকে প্রতিদিন যে হারে অমানবিকতার স্তূপ জমা হচ্ছে, তাতে মনে হয় না মনুষ্যত্ব নামক কোনো কিছু এই সমাজে আছে! দুঃখজনক হলেও সত্য, মানুষের যা কল্পনার বাইরে, স্বয়ং মানুষের দ্বারাই তা ঘটছে! সত্যিকার অর্থেই আজও আমরা ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে পারিনি বুঝি। দেশে এমন সব ঘটনা ঘটছে যে, যাকে ‘অস্বাভাবিকের চেয়েও অস্বাভাবিক’ বললে কম বলা হয়!
মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ হওয়া কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ হতেই পারে, আবার সেই বিরোধ মিটেও যায়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধের জেরে গাছের ওপর তার প্রতিশোধ নেবে—এ কেমন কথা!
কৃষক সন্তোষ সরকার বাড়ির পাশে দেড় একর জমিতে ২ হাজার ৫০০ চালকুমড়ার গাছ রোপণ করেছিলেন। এতে তাঁর ব্যয় হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। পরিবারের সবটুকু সঞ্চয় বাদেও ব্যয় মেটাতে কিছু টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ইতিমধ্যে সবগুলো গাছে ফুল ধরেছে। কিছু গাছে ছোট ছোট চালকুমড়াও ধরেছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি পুরোদমে চালকুমড়া বিক্রি করার কথা ছিল তাঁর।
তিনি আশা করেছিলেন, এই চালকুমড়া বিক্রি করে তাঁর ১০-১২ লাখ টাকা আয় হবে। কিন্তু সম্প্রতি রাতের বেলা খেতের সব গাছের গোড়া কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আর পরদিন সকাল থেকে গাছ শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে।
এ ঘটনায় শুধু কি এককভাবে কৃষক সন্তোষ সরকারের ক্ষতি হয়েছে? ক্রেতা বা ভোক্তা পর্যায়েও এর ক্ষতির দিক অনেক। অনেক সময় এমনিতেই বাজারে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির উৎপাদনে ঘাটতি থাকে। আবার সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কারণেও সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে থাকে। তাই সন্তোষ সরকারের চালকুমড়াখেতের ক্ষতি আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তির হলেও এর প্রভাব অন্য সব ক্রেতাসাধারণ এবং বাজারেও যে পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ রকম অমানবিক ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর ঘটতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যের দায়িত্ব অনেক। প্রকৃত অপরাধীকে বিচারের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনলে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনা ঘটার পরিমাণ কমে যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এ ধরনের অমানবিক ভাবনার জন্ম কী করে হচ্ছে মানব সমাজে, তার তত্ত্বতালাশ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই ‘রোগের’ নিরাময় হবে না।