আজকের পত্রিকায় গত সোমবারের একটি সংবাদের শিরোনাম, ‘দিল্লি ঘুরে রাজনীতি কি এখন সিঙ্গাপুরে’ শিরোনামটি যথার্থ। সামনে নির্বাচন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও এখন অনেক ধরনের জল্পনা-কল্পনা।
আদতেই দেশে নির্বাচন নিয়ে কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বাড়ছে। তবে এ কথা সত্য, রাজনীতিসচেতন অনেকেই ভাবছেন, দেশের রাজনীতির ভবিতব্য নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়নকদের কার্যাবলির ওপর। আমাদের দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্ব রাজনীতির নাটের গুরুরা।
আদতেই আমাদের দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের হাতে কি না, তা নিয়ে গণমাধ্যমেও লেখালেখি, দেখাদেখিসহ (সরাসরি সাক্ষাৎকার) নানা কিছু চলছে। মার্কিনদের ভাবনা কী, তাদের দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় আমাদের দেশের লাভ-ক্ষতি কী কী হতে পারে, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে কী বোঝাতে চাইবেন, চীনের প্রধান নেতার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কী কথা হলো, ভারত কীভাবে দেখছে বাংলাদেশকে, কেন বিএনপির বড় নেতারা সিঙ্গাপুরে—এই আলাপগুলোয় সরগরম হয়ে রয়েছে চা-খানা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এই সব আলোচনায় সবই আছে, শুধু একটি জরুরি বিষয়ই নেই তা হলো—নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ।
বাংলাদেশের জনগণ পাঁচ বছরের মধ্যে শুধু একটি দিনেই নিজের মতামত জানাতে পারেন। তাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পাঁচ বছরের জন্য কোনো দলকে নির্বাচিত করতে পারেন। এরপর জনগণের সঙ্গে শাসক কর্তৃপক্ষের আর কোনো যোগাযোগ থাকে না।
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আমাদের রাজনীতিতে শাসকশ্রেণি নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার প্রবণতার কাছে সমর্পিত হয়। জনগণের সেবা করার কথা তাঁরা ভুলে যান। দিনের পর দিন, সরকারের পর সরকার এই প্রবণতার কাছে পরাজিত হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তাঁদের কাছের লোকদের সম্পদের হিসাব নিলে খুব কমসংখ্যক জনপ্রতিনিধিই নিজেদের বাড়তি টাকার হিসাব মেলাতে পারবেন।
আক্ষেপের বিষয়, এই বাড়তি টাকা কোত্থেকে এল, তার হিসাব নিয়ে শুধু তখনই কথা ওঠে, যখন ক্ষমতাসীন কেউ ক্ষমতাচ্যুত হন; অর্থাৎ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্পদের হিসাব নেওয়াটা রেওয়াজ নয়; বরং প্রতিহিংসার কারণে হিসাব নেওয়া হয়। এটা আমাদের রাজনীতির অন্ধকার দিক।
রাজনীতির কাছে জনগণের সেবা করাটাই যদি মুখ্য হতো, তাহলে রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতায় গেলেও জনগণের কাছেই থাকতেন। কিন্তু তাঁরা মূলত থাকেন শিল্পপতি, ব্যাংকার, টাকাওয়ালা মানুষের আশপাশে। দেশের উন্নয়নের জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়, সেই টাকায় নিজের উন্নয়ন কতটা হবে, সেদিকেও থাকে তাঁদের নজর।
সততা ও দক্ষতার দিকে ততটা নয়। কার্যকর শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারলে ঘুষ-দুর্নীতির হাত থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পারত দেশ। কিন্তু আমাদের প্রশাসনকে ঠিক পথে আনার চেষ্টা কোনো সরকারের আমলে কি দেখা গেছে? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কীভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকে, সেটা নিশ্চয়ই জনগণের কাছে অবোধ্য নয়। কিন্তু এই বিশাল আমলাতন্ত্রের ভার বহন করা ছাড়া জনগণের আর উপায়ও কিছু নেই।
তাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনায় মুখ্য হয়ে ওঠে অন্যান্য দেশ, দেশের জনগণ নয়। এটাই আক্ষেপের কথা।