পাঞ্জাবের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘সতলুজ’ সিনেমার মতো এত বড় বিতর্ক ও আলোড়ন খুব কম সিনেমাই তৈরি করতে পেরেছে। জশবন্ত সিং খালরা নামের এক শিখ মানবাধিকারকর্মীর জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এ সিনেমা মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও সতলুজ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে বলে গতকাল জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ভ্যারাইটি।
তবে সরকারি নির্দেশে সরিয়ে নেওয়ার পর সিনেমাটির প্রচার তো থামেইনি, বরং তা এক অভিনব মোড় নিয়েছে। পাঞ্জাবের মাটিতে এই সিনেমা অভূতপূর্ব প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছে। রূপ নিয়েছে গণ-আন্দোলনে। পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে স্বেচ্ছাসেবী ও রাজনৈতিক উদ্যোগে সতলুজের গণপ্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এভাবে সতলুজের গল্প ও বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে, যা সেন্সরশিপ ও বাক্স্বাধীনতার লড়াইয়ে এক নজিরবিহীন মাত্রা যোগ করেছে।
রাষ্ট্রের চরম দমন-পীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একজন সাধারণ মানুষের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াইয়ের গল্প সতলুজ। আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে শিখ চরমপন্থী আন্দোলন দমনের নামে পাঞ্জাবে সৃষ্টি হয় অস্থির ও সংঘাতময় পরিবেশ। সেই সময়ে পুলিশের দ্বারা সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও অবৈধভাবে লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাগুলো তুলে আনেন জশবন্ত সিং খালরা। এই সংবেদনশীল তথ্য ও প্রমাণ যখন তিনি আন্তর্জাতিক ফোরামসহ বিশ্ব দরবারে প্রকাশ করতে শুরু করেন, তখন প্রশাসনের মূল টার্গেটে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে তাঁকেও অপহরণ ও হত্যা করা হয়।
হানি ত্রেহান পরিচালিত এ সিনেমার নাম প্রথমে ছিল ‘ঘালুঘারা’ (যার অর্থ গণহত্যা), পরে নাম রাখা হয় ‘পাঞ্জাব ৯৫’। শুটিং শেষ হয় ২০২৩ সালে। তবে সেন্সর বোর্ডের একের পর এক আপত্তিতে পিছিয়ে যায় মুক্তি। সিনেমার নাম পরিবর্তন, খালরার নাম বাদ দেওয়াসহ ১২৭টি স্থানে কাটের নির্দেশ দিলে নির্মাতারা আপস করতে অস্বীকৃতি জানান। সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে দীর্ঘ তিন বছরের লড়াই শেষে ৩ জুলাই ওটিটিতে সতলুজ নামে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে মাত্র দুই দিনের মাথায় সিনেমাটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় জি-ফাইভ।
সতলুজ সিনেমাটি ওটিটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে শিখদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান শ্রী অকাল তখত সাহেবের প্রধান কুলদীপ সিং গর্গজ বলেন, ‘শিখদের ওপর হওয়া অত্যাচারের সত্যকে এভাবে চেপে রাখা যাবে না।’ প্রতিবাদ জানিয়ে শিরোমণি গুরুদুয়ারা প্রবন্ধক কমিটি বিশাল মিছিল করেছে। সিনেমাটি ওটিটিতে পুনর্বহালের দাবিতে একটি জনস্বার্থ মামলাও করা হয়েছে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে।
সতলুজের প্রদর্শনী নিষিদ্ধের ঘটনাকে বিজেপি ও কংগ্রেসের যৌথ ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছে পাঞ্জাবের ক্ষমতাসীন আপ সরকার। পাঞ্জাব বিধানসভার স্পিকার কুলতার সিং সান্ধওয়ান তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সিনেমাটির কমিউনিটি স্ক্রিনিংয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। শিরোমণি আকালি দল ঘোষণা করেছে, তারা পাঞ্জাবের প্রতিটি গ্রামে এই সিনেমার প্রদর্শনীতে অর্থায়ন করবে।
অন্যদিকে, সতলুজের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজেপি। দিলজিৎ দোসাঞ্জকে ‘ভণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পাঞ্জাবের বিজেপি নেতা রভনীত সিং বিট্টু। তাঁর অভিযোগ, দিলজিৎ স্রেফ টাকা কামানোর জন্য এবং পাঞ্জাবের শান্ত পরিবেশ নষ্ট করার জন্য মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। বিজেপির মূল আপত্তি হলো, সিনেমাটিতে সেই সংঘাতময় দিনগুলোর একতরফা চিত্র দেখানো হয়েছে, যেখানে পুলিশকে ঢালাওভাবে অপরাধী বানানো হয়েছে কিন্তু উগ্রপন্থীদের সহিংসতাকে আড়াল করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সতলুজ সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার যে সেন্সরশিপ আরোপ করতে চেয়েছিল, তা আদতে হিতে বিপরীত হয়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছে।