ঘোষিত হয়েছে ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা। ‘সাঁতাও’ সিনেমার জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার পাচ্ছেন খন্দকার সুমন। একই সিনেমার জন্য আইনুন নাহার পুতুল পাচ্ছেন সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। অন্যদিকে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার ‘ঈশ্বর’ গানের জন্য সেরা সুরকার হয়েছেন প্রিন্স মাহমুদ। আর ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার ‘গোটা পৃথিবীতে খুঁজো’ গানের জন্য অবন্তী সিঁথি নির্বাচিত হয়েছেন সেরা গায়িকা হিসেবে। সবারই এটি প্রথম জাতীয় পুরস্কার। তাঁরা বললেন নিজেদের অনুভূতির কথা।
এবার পুরস্কার পাওয়াটা চমকের মতো লাগছে
প্রিন্স মাহমুদ, সুরকার
যেকোনো পুরস্কার কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দেয়। দায়িত্বটাও বেড়ে যায়। যত দিন সুস্থ থাকি, আরও কাজ করার ইচ্ছা জেগে উঠল। ২০০৩ সালে ‘কষ্ট’ সিনেমায় যখন জেমসের গাওয়া ‘মা’ গানটি ব্যবহার করা হলো, তখন থেকেই শুনে আসছি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে যাব। ২০০৯ সালে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমায় লিমনের গাওয়া ‘জেলখানার চিঠি’ গানের বেলাতেও এমন শুনেছিলাম। প্রথম দিকেই আমার নাম আছে, তেমন খবরও পেয়েছিলাম। কিন্তু পুরস্কার আর পাওয়া হয়নি।
এবারও ‘প্রিয়তমা’ মুক্তির সময় থেকে শুনছিলাম ‘ঈশ্বর’ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাব। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতার কারণে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অবশেষে পুরস্কারটি পেলাম। দুই যুগ ধরে ‘না’ শুনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে এবার পুরস্কার পাওয়াটা চমকের মতো লাগছে। তবে সিনেমায় আপাতত আর কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিছু কাজ হাতে নেওয়া আছে, সেগুলো অবশ্যই শেষ করব। নিজের কিছু গান করার পরিকল্পনা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত আমার। ভবিষ্যতে সময়ের প্রয়োজনে যদি আবার সিনেমার গান করা লাগে, সেটা তখন দেখা যাবে।
তালিকায় নিজের নাম দেখে চমকে গিয়েছিলাম
অবন্তী সিঁথি, সংগীতশিল্পী
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকায় আমার নাম দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না। প্রথমে গীতিকার রবিউল ইসলাম জীবন আমাকে খবরটি দেন। প্রজ্ঞাপনটি দেখে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবলাম, ঘুমের ঘোরেই আছি হয়তো।
আবার দেখলাম, নাহ সত্যিই আমার নাম! জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রজ্ঞাপনে সেরা গায়িকা বিভাগে আমার নাম। চমকে গেলাম! আমি তো এ রকমটাই স্বপ্ন দেখতাম, এত দিনে সেটা সত্যি হলো! যেকোনো মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা কাঙ্ক্ষিত বিষয়। আমার কাছেও তাই। শিল্পী হিসেবে এই স্বীকৃতি সর্বোচ্চ পাওনা। যাঁরা আমাকে এই সম্মাননার যোগ্য মনে করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা জানাই এই গানের স্রষ্টা তানজীব সরোয়ার, সাজিদ সরকারসহ সুড়ঙ্গ সিনেমার কলাকুশলীদের।
মা-বাবা বেঁচে থাকলে আজ খুব খুশি হতেন। তাঁদের কথা খুব মনে পড়ছে। আমার সব অনুরাগী ও শ্রোতাকে জানাই অফুরন্ত ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা। তাঁদের কারণেই আমি আজকের অবন্তী সিঁথি।
এই অর্জন যেন ধরে রাখতে পারি
আইনুন নাহার পুতুল, অভিনেত্রী
এখনো ভাবছি, স্বপ্নে আছি। ভাবতে পারছি না, এটা আদৌ সত্য কি না। মনে হচ্ছে, স্বপ্ন দেখছি, কিছুক্ষণ পর হয়তো ভেঙে যাবে। সব মিলিয়ে এখনো ঘোরের মধ্যে কাটছে। আমার মাকে নিয়ে গত দুই বছর ভীষণ স্ট্রাগল করছি। এই সময়ে এমন একটা সংবাদ শুনে আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা আমার। বিচারকদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা। তাঁরা আমাকে যোগ্য মনে করেছেন বলেই আজকে আমার এই অর্জন।
এটি আমার একার প্রাপ্তি নয়। নির্মাতা খন্দকার সুমন ভাইসহ সবার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা। বড় পুরস্কার পাব, অনেক টাকাপয়সা পাওয়া যাবে—এমনটা ভেবে কাজ করিনি। আমি রংপুরের ভাষা জানতাম না। রিমি নামের এক ছোট বোন আমাকে ভাষা শিখিয়েছে। কৃতজ্ঞতা আমার সহশিল্পী ফজলুল ভাইয়ের প্রতি। অভিনয়ের ক্ষেত্রে একজন ভালো সহশিল্পীর খুব প্রয়োজন। সেটা পেয়েছিলাম বলেই আজকে আমার এই প্রাপ্তি। দুই দশক ধরে কাজ করছি শোবিজে। হয়তো তারকা হতে পারিনি। কিন্তু নির্মাতা, সহশিল্পী, দর্শকদের ভালোবাসায় এখনো কাজ করে যাচ্ছি। সেটার স্বীকৃতি হয়তো এই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সবার কাছে দোয়া চাই যেন এই অর্জন ধরে রাখতে পারি।
স্বীকৃতি পেলে সেই কাজের প্রতি মানুষের মনোযোগ বাড়ে
খন্দকার সুমন, পরিচালক
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে অনেক আনন্দের। নিজের পুরস্কার পাওয়ার চেয়ে আমি বেশি আনন্দিত আমাদের কলাকুশলীদের স্বীকৃতিতে। আমি দেখেছি তাঁরা কী পরিমাণ কষ্ট করেছে এ সিনেমায়! যখন কোনো কাজ স্বীকৃতি পায়, তখন সেই কাজের প্রতি মানুষের মনোযোগ বাড়ে।
আমাদের সিনেমায় তো জাঁকজমক আয়োজন থাকে না, অনেক টাকার খেলা থাকে না। অনেকেই হয়তো একটু নিচু চোখে দেখে। রাষ্ট্র মনে করেছে, আমরা কিছু একটা করতে পেরেছি, এটা সামনে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা দেবে।
পুরস্কারের চেয়ে বড় ব্যাপার হবে, এই কাজটা যে অঞ্চলের মানুষের জন্য করলাম, তাদের যখন মূল্যায়ন করা হবে। সিনেমাটি এমন একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গল্পে নির্মিত হয়েছে, শহরের চাকচিক্যের জায়গা থেকে যাদের হয়তো অতটা চোখে পড়ে না। সাঁতাও সিনেমার মধ্য দিয়ে সেই মানুষদের গল্প বলার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, রাষ্ট্র ওই জনগোষ্ঠীর প্রতি গুরুত্ব দেবে। সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।